রাজনৈতিক বিটে কাজ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাবের মধ্যে পড়ে যান। কেউ বিএনপির নিউজ কাভার করতে গিয়ে বিএনপির মতো চিন্তা করেন, কেউ আওয়ামী লীগ কাভার করতে গিয়ে সেই অবস্থানে চলে যান। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা। শনিবার রাজধানীর র্যাডিশন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’ এর দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় এ মন্তব্য করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
গণমাধ্যম, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সম্পর্ক নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি বলেন, রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো অনেক সাংবাদিক বিট কাভার করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই সংশ্লিষ্ট দলের সঙ্গে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। অথচ একজন রিপোর্টারের পরিচয় হওয়া উচিত কেবল সাংবাদিক হিসেবে। ‘আমি আওয়ামী লীগ কাভার করতে এসেছি, বিএনপি কাভার করতে এসেছি বা জামায়াত কাভার করতে এসেছি, এটা ভাবলে চলবে না। আমি এসেছি সাংবাদিকতা করতে, এটাই আমার একমাত্র সুরক্ষা,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, শুধু সাংবাদিকদের দায়ী করলেই হবে না; সংবাদমাধ্যমের ভেতরেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক বিটে এমন সাংবাদিকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সফট কর্নার রয়েছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোরও নিজেদের পছন্দের সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করার প্রবণতা আছে। ফলে তথ্যপ্রাপ্তি, যোগাযোগ ও প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও অঘোষিত বাধা তৈরি হয়।
সমকাল সম্পাদক বলেন, রাজনৈতিক বিট মানেই শুধু দলীয় সংবাদ সম্মেলন বা বক্তব্য সংগ্রহ নয়। একজন রাজনৈতিক রিপোর্টারকে সংবিধান, রাষ্ট্রের আইন, দলগুলোর গঠনতন্ত্র এবং শাসনব্যবস্থার কাঠামো সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকতে হবে। কারণ সাংবাদিকতা মূলত অনিয়ম, অপব্যবহার ও জবাবদিহির প্রশ্ন নিয়ে কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমের ভেতরে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে আলাদা শেখার পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। ‘একজন রাজনৈতিক রিপোর্টারকে শুধু একটি দলের খবর জানলেই হবে না- রাষ্ট্র কীভাবে চলে, সংসদ কীভাবে পরিচালিত হয়, আইন কীভাবে কাজ করে, এসবও জানতে হবে তাকে,’ বলেন তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী কণ্ঠ তুলে ধরার বিষয়টিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন শাহেদ মুহাম্মদ আলী। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা, দলগুলোর অতীত ভূমিকা এবং সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে বিরোধী কণ্ঠ যথাযথভাবে উপস্থাপন করা অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে। এতে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।
সংসদ রিপোর্টিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন কাভার করতে গিয়ে দেখা গেছে, যেসব রিপোর্টার আগে শুধু দলীয় বিট কাভার করেছেন, তাদের অনেকেই সংসদীয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদের নিয়ম না বুঝে সংসদ কাভার করা যায় না। তাই আমরা রাজনৈতিক বিটের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন কাভার করা রিপোর্টারদেরও সংসদে পাঠিয়েছি। অনেককে নতুন করে শিখতে ও বুঝতে উৎসাহ দিতে হয়েছে।
শাহেদ মুহাম্মদ আলীর মতে, রাজনৈতিক সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে ভাবার এখনই সময়। শুধু বিটভিত্তিক দায়িত্ব নয়, জ্ঞান, দক্ষতা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও নৈতিক অবস্থান-সব মিলিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ সাংবাদিক তৈরি করাই এখন গণমাধ্যমের বড় চ্যালেঞ্জ।