বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে কূটনৈতিক উপহার বেছে নেওয়া বেশিরভাগ সময় কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, উপহার পছন্দ না হলে বা ভুল বার্তা গেলে তা ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে। বিষয়টি অনেকটা খুঁতখুঁতে আত্মীয়ের জন্য উপহার বেছে নেওয়ার মতো।
তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে বিদেশি নেতা ও তাদের প্রতিনিধিদল শুধু কী কথা বলবেন তা নয়, কী উপহার দেবেন সেটিও নিয়ে আলাদা করে চিন্তা করেন।
তবুও কূটনৈতিক উপহার আদান-প্রদান বহু প্রাচীন সময় থেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘ডিপ্লোম্যাটিক গিফটস: অ্যা হিস্ট্রি ইন ফিফটি গিফটস’ বইয়ে এই ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর আমারনা পত্রাবলিতে এক রাজা অন্য রাজাকে দেওয়া জাঁকজমকপূর্ণ উপহারের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব পত্র প্রাচীন মিশরের আখিতাতেন শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
বর্তমান সময়েও বিশ্বনেতাদের বৈঠকে উপহার বিনিময়ের রীতি রয়েছে। তবে এখনকার উপহারগুলো প্রাচীন যুগের সোনা বা দাস উপহারের মতো এত বড় বা জাঁকজমকপূর্ণ নয়।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মার্সেল মসের ১৯২৫ সালের রচনা ‘এসাই সুর লে ডন’-এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেন উপহার কূটনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্য। মসের মতে, উপহারের একটি সামাজিক ভূমিকা রয়েছে।
শুধুমাত্র কোনো জিনিস ক্রয় করা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কোনো স্থায়ী বন্ধন তৈরি করে না, কিন্তু একটি উপহার একটি চলমান সম্পর্ক স্থাপন করে।
কূটনীতি এই ধরনের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে এবং উপহার তা সহজতর করতে সাহায্য করে। এই ধরনের একটি বন্ধন তৈরি করতে তিনটি বাধ্যবাধকতা অবশ্যই পূরণ করতে হয়, উপহার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, উপহার গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা এবং প্রাপ্ত উপহারের প্রতিদান দেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
কিন্তু কূটনৈতিক উপহার হিসেবে কী দেওয়া যায়? গবেষক মার্সেল মস মেলানেশিয়ার উপহার বিনিময় প্রথা নিয়ে গবেষণা করে দেখেছিলেন, এসব উপহার সাধারণ কেনাবেচার জিনিসের মতো হতো না। এগুলো হতো বিশেষ ও ব্যতিক্রমী।
কূটনৈতিক উপহারের উদ্দেশ্যই হলো অন্য পক্ষকে মুগ্ধ করা বা বিস্মিত করা। এজন্য ইতিহাসে অনেক সময় বিরল প্রাণীকেও উপহার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ৮০২ সালে আব্বাসীয় খলিফা শার্লমেনকে একটি হাতি উপহার দিয়েছিলেন। আবার আধুনিক সময়ে চীনের পান্ডা কূটনীতিও একই ধরনের উদাহরণ।
গ্রিকরা যখন ট্রোজানদের সেই সুন্দর কাঠের ঘোড়াটি উপহার দিয়েছিল, তখন উপহার দাতার স্বার্থ রক্ষা করার বিষয়টি তাদের মনে রাখলে ভালো হতো। আর যখন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য উপহার বাছাইয়ের প্রশ্ন আসে, তখন দাতারা ফলপ্রসূ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে একটি ভালো ধারণা তৈরি করতে চান। সেই প্রেসিডেন্ট যখন আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন সঠিক উপহার বাছাইয়ের গুরুত্ব আরো অনেক বেড়ে যায়। যিনি সম্মান প্রত্যাশা করেন এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন।
অন্য দেশের নেতার জন্য উপহার বাছাই করতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় উপহারটি ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে উপহারদাতা দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। যেমন, কিউবার নেতাদের কাছে চুরুটের বাক্স জনপ্রিয় উপহার হিসেবে পরিচিত। আবার কখনও এমন উপহার দেওয়া হয়, যা প্রাপক দেশের সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার বার্তা দেওয়া হয়। কিছু উপহার দুই দেশের অতীতের ভালো সম্পর্কের স্মৃতিও তুলে ধরে। আবার কখনও উপহারকে আরো ব্যক্তিগত করতে নেতার ব্যক্তিগত পছন্দ বা আগ্রহের বিষয়ও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চীনের রাষ্ট্রপতিরা কূটনৈতিক উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত বিশেষ কৌশল অনুসরণ করেন। অনেক সময় তারা রেশম বা বার্নিশের তৈরি ঐতিহ্যবাহী জিনিস উপহার দেন। এর মাধ্যমে সাধারণত চীনের সূক্ষ্ম কারুশিল্পকে তুলে ধরা হয়।
এ ধরনের উপহার সাধারণত এমন দেশগুলোর জন্য দেওয়া হয়, যাদের সঙ্গে চীন নিজেকে বেশি প্রভাবশালী অংশীদার হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত উপহার অনেক সময় দামে খুব বেশি না হলেও চিন্তাভাবনা করে বেছে নেওয়া হয়। এসব উপহার সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতাদের জন্য রাখা হয়।
ইতিহাসে দেখা যায়, রাশিয়ার সম্রাট পিটার দ্য গ্রেট নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের এমন জিনিস উপহার দিতেন, যা তিনি নিজেই তৈরি করতেন। এতে উপহারে ব্যক্তিগত গুরুত্ব আরো বেড়ে যেত।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে যে উপহারগুলো পেয়েছেন, তাতে প্রায়ই একটি উপযুক্ত ও ব্যক্তিগত উপহার বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে নানা চিন্তাভাবনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গলফের প্রতি আগ্রহকে কাজে লাগিয়েই এক বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়।
২০২৫ সালের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা হোয়াইট হাউসে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার গলফ কোর্স নিয়ে লেখা একটি বইই আনেননি, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন দেশটির দুই বিখ্যাত গল্ফার আর্নি এলস এবং রেটিফ গুসেনকেও।
অন্যান্য বিশ্বনেতারাও অনেক সময় গলফ সম্পর্কিত উপহার ব্যবহার করে কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অক্টোবরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ব এশিয়া সফরের সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাকে একটি বিশেষ ‘পুটার’ উপহার দেন। সেটি ছিল জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ব্যবহৃত। শিনজো আবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই এই উপহারকে দুই দেশের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
আগস্ট মাসে হোয়াইট হাউস সফরের সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একটি পুটার নিয়ে এসেছিলেন, যেটি ছিল ইউক্রেনীয় সৈনিক কস্তিয়ানতিন কার্তাভৎসেভের। যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোতে রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি একটি পা হারিয়েছিলেন। পুটারটিতে ‘আসুন একসঙ্গে শান্তির জন্য পুট করি!’ বাক্যটি খোদাই করা ছিল। কার্তাভৎসেভের খেলার একটি ভিডিও দেখার পর ট্রাম্প তার প্রশংসা করেন।
বিশ্বনেতারা অনেক সময় এমন ব্যক্তিগত উপহার দেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
গত জুলাইয়ে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি ট্রাম্পকে ১৯২১ সালের একটি আদমশুমারির নথি উপহার দেন, যেখানে ট্রাম্পের মায়ের ছোটবেলার তথ্য ছিল। পাশাপাশি ট্রাম্পের নানা-নানীর ১৮৫৩ সালের বিয়ের নথিও তুলে দেওয়া হয়।
একইভাবে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সফরের সময় তার জার্মানিতে জন্ম নেওয়া দাদার জন্মসনদের একটি অনুলিপি উপহার দেন। কখনও কখনও এসব উপহার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সমর্থনের বার্তাও বহন করে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নপত্র সোনার ফ্রেমে বাঁধাই করে উপহার দেন।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মাচাদো ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক তুলে দেন। পরে নোবেল শান্তি কেন্দ্র জানায়, সেটি ছিল শুধু পদক, পুরো নোবেল পুরস্কারের সম্মান নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়া সব উপহারই যে খুব ব্যক্তিগত ছিল, তা নয়। যেমন সেন্ট প্যাট্রিক দিবস উপলক্ষে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন ট্রাম্পকে শেমরক ফুলে ভরা একটি ওয়াটারফোর্ড ক্রিস্টালের বাটি উপহার দেন। এই প্রথা ১৯৫২ সাল থেকে চলে আসছে।
কূটনৈতিক উপহার অনেক সময় সম্পর্কের ওপর প্রভাবও ফেলেছে। প্রাচীন মিসরের আমারনা পত্রাবলিতে দেখা যায়, মিতান্নির রাজা তুশরাত্তা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, কারণ তাকে প্রতিশ্রুত খাঁটি সোনার মূর্তির বদলে সোনার পাত মোড়ানো কাঠের মূর্তি পাঠানো হয়েছিল।
আধুনিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে কূটনৈতিক উপহারের ওপর কঠোর নিয়ম রয়েছে। সংবিধানের ‘এমোলিউমেন্টস ক্লজ’ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে উপহার নিতে কংগ্রেসের অনুমতি প্রয়োজন। পরে ১৯৬৬ সালের আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি উপহার ব্যক্তিগতভাবে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়। এসব উপহার পরে জাতীয় আর্কাইভ বা প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে জমা রাখা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার মতো আরো কিছু দেশও কূটনৈতিক উপহারের মূল্যের সীমা নির্ধারণ করেছে, যাতে দুর্নীতি বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ না ওঠে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ এখনও জাঁকজমকপূর্ণ উপহার দেওয়ার ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
২০১৫ সালে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে প্রায় ৫ লাখ ২৩ হাজার ডলারের উপহার দিয়েছিলেন। আর ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে আলোচিত কূটনৈতিক উপহার ছিল কাতারের রাজপরিবারের দেওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ জেট বিমান, যা এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল।
গবেষক মার্সেল মসের মতে, উপহার মানেই এক ধরনের প্রতিদানের প্রত্যাশা। তাই বড় কূটনৈতিক উপহার নিয়ে সব সময় প্রশ্ন ওঠে, এর বিনিময়ে কী চাওয়া হতে পারে। কাতারের রাজপরিবার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে বোয়িং ৭৪৭-৮ উপহার দিয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। তখন ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার জন্য কাতারের পক্ষ থেকে ‘ধন্যবাদ’। অর্থাৎ, উপহারটিকেই প্রতিদান হিসেবে দেখানো হয়।
এ ধরনের ধন্যবাদসূচক উপহারের ইতিহাসও পুরোনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ের রাজা ও সরকারকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ১৯৪৭ সাল থেকে অসলো শহর প্রতি বছর লন্ডনকে একটি ক্রিসমাস ট্রি উপহার দেয়।
সম্প্রতি ব্রিটিশ রাজা চার্লস তৃতীয় ট্রাম্পকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাবমেরিন এইচএমএস ট্রাম্পে ব্যবহৃত একটি আসল ঘণ্টা উপহার দেন। এই উপহারটি ছিল কম দামের হলেও প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের পুরোনো সামরিক জোট ও বর্তমান সহযোগিতার বার্তা তুলে ধরে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন যত্ন করে বেছে নেওয়া উপহার দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়, এমন প্রমাণ খুব কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো বৈঠকের শুরুতে সম্পর্ক উষ্ণ করার প্রতীক হিসেবেই কাজ করে।