মেরাজ মিয়া একজন বড় গৃহস্থ। তিনি হাওরে ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। ক্ষেতের ধান সবে সোনার বরণ ধরতে শুরু করেছিল। তখন টানা বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে সব তলিয়ে যায়। তা ছাড়া তাঁর ছিল এক হাজার রাজহাঁস। পানির তোড়ে হাঁসগুলো কোথায় যে ভেসে গেছে! ধান আবাদ করতে মহাজনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা ভেবে কিনারা পাচ্ছেন না। তাঁর সাত সদস্যের পরিবার চলবে কেমন করে!
মেরাজ মিয়া বলেন, ‘৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান অইতো, ওই খলায় অহন ২০ মণ ধানও নাই। ঋণের জ্বালায় বাড়িঘর ছাড়া লাগব। গিরস্তি আর করতাম না, সব ধান গেজায়া গেছে। ক্ষেত বেইচ্যা লগ্নি দিতে অইব। কষ্টটা অইলো, খলাত কিছু ধান আইন্নাও শুকাইতে পারলাম না। সব ধান জালায়া নষ্ট অইয়া গেছে। অহন ঢাহা (ঢাকা) যাওয়া ছাড়া রাস্তা নাই। আর ঢাহায় গিয়া কিতা করাম, রিকশা চালাইতে অইবো।’
মেরাজের বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায়। কিন্তু তিনি অষ্টগ্রাম উপজেলার মাদলার হাওরে বোরোর আবাদ করেছিলেন। শুক্রবার তাঁর সঙ্গে কথা হয়। কিশোরগঞ্জে গতকাল সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি আর কালো মেঘের আনাগোনার পর এমন রোদ কিছুটা স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই রোদও হাওরের কৃষকদের মুখে হাসি ফেরাতে পারেনি। চারদিকে ভেজা ধান, পচা গন্ধ আর কৃষকের বোবা কান্না।
কিশোরগঞ্জ শহর থেকে নিকলী সদর উপজেলার দিকে হাওরমুখী সড়কে উঠতেই চোখে পড়ে গ্রামের পাকা-কাঁচা সড়ক, উঁচু খোলা জায়গা, বাড়ির আঙিনায় ধান শুকানো হচ্ছে। কেউ পলিথিন বিছিয়ে ধান মেলেছেন, কেউ চটের চাটাইয়ে, কেউবা সরাসরি সড়কের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছেন।
কয়েকজন কৃষক বলছিলেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে কিছু ধান কেটে এনেছিলেন। কিন্তু রোদের অভাবে শুকাতে পারেননি। নিকলী উপজেলা কৃষি অফিসের কাছে থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অষ্টগ্রামের দিকে যতই হাওরের ভেতরে যাওয়া যায়, ততই স্পষ্ট হয় ক্ষতির চিত্র। কোথাও ডুবে থাকা ধানের গাদা, কোথাও কাদামাখা ক্ষেত, কোথাও থইথই পানি।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর মাদলার হাওরে পৌঁছানোর পর গৃহস্থ মেরাজসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। কৃষক অজি উল্যাহর হাতে চারা গজানো ধান। কয়েক দিন আগে কেটে রাখা ধান বৃষ্টির পানিতে ভিজে ছিল। রোদ ওঠার পর শুকাতে গিয়ে দেখেন, অঙ্কুর গজিয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই যে ধান সব ফানির নিচে ডুব্বে গেছে, এহন লগ্নি কেমনে দেম? নিজেরা খায়াম কী আর ফোলাফাইনতেরে লেহাফড়া কেমনে করাইয়াম?’