Image description

হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও কাঙ্ক্ষিত পানি উৎপাদন করতে পারছে না ঢাকা ওয়াসা। এর ফলে রাজধানীতে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে রাজধানীর বাসিন্দারা শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র কষ্ট ভোগ করছেন। চলতি মৌসুমে পানির সংকটে রাজধানীর অর্ধশত এলাকার বাসিন্দারা অসহ্য কষ্ট ভোগ করছেন। ঢাকা ওয়াসা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা ওয়াসা পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। ২০১৯ সালে চালু এই প্রকল্প থেকে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন হওয়ার কথা থাকলেও এখন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৫ কোটি লিটার। কারণ হিসাবে জানা গেছে, পদ্মা নদীর মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়া পয়েন্ট থেকে ঢাকার মিটফোর্ট পর্যন্ত পাইপলাইনে ৪৫ কোটি লিটার পানি আনার সক্ষমতা থাকলেও, ঢাকার ভেতরে ওই চাপের পানি সরবরাহের মতো পাইপলাইন নেই।

মেঘনার পানি শোধন করে রাজধানীবাসীকে সরবরাহ করতে ২০১২ সালে ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে গন্ধপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। ধাপে ধাপে সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে চুক্তির শর্ত বিতর্কে ফিনিশিং কাজ বন্ধ। সামান্য কারণে ওই প্রকল্পের দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী।

একই অবস্থায় পড়ে আছে, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়)। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প থেকে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি পাওয়ার কথা। ইতোমধ্যে প্রকল্প থেকে পানি পাওয়ার কথা থাকলেও কাজ শুরু হয়েছে কয়েকমাস আগে। নানা জটিলতা ও প্রশাসনের অদক্ষতায় ৫ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকায়। এছাড়া সাভারের ভাকুর্তার পানি শোধনাগার প্রকল্প তৈরি করা হয় প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার পানির প্রত্যাশায়। কখনো ওই প্রকল্প থেকে পূর্ণ সক্ষমতার পানি পাওয়া যায়নি। শুষ্ক মৌসুমে ৭ থেকে ৮ কোটি কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং নলকূপগুলোর পানির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ঢাকা ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী পানি উত্তোলন হচ্ছে না।

এ প্রকল্পে ঢাকা ওয়াসা খরচ করেছে ৫২১ কোটি টাকা। ঢাকা ওয়াসা সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকল্প সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সংকট বিরাজ করছে ঢাকা ওয়াসার পানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়। বিশেষ করে-প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পাম্পিং স্টেশনের মেরামত, লোড শেডিং ও জ্বালানি সংকট। এছাড়া ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, সিস্টেম লস এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলেও সংকট প্রকট হচ্ছে। তারা আরও বলেন, ঢাকার দৈনিক পানির চাহিদা ২৯০ কোটি লিটার। আর ওয়াসার উৎপাদন সক্ষমতা ৩১০ কোটি লিটার বলে দাবি করা হচ্ছে। পানির ভয়াবহ সংকটের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, ওয়াসার উৎপাদন সক্ষমতার হিসাবের কোনো গড়মিল রয়েছে। যেই সক্ষমতা নেই, বাড়িয়ে তা দেখানো হচ্ছে। অথবা চাহিদার হিসাব সঠিকভাবে করা হয়নি। পাশাপাশি সিস্টেম লস প্রায় ২০ শতাংশ থাকলেও তা গোপন করা হচ্ছে।

বিগত সরকারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সময়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তৈরি করা সফলতার পরিসংখ্যানের এখন বাস্তব অবস্থা বেরিয়ে আসছে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচে কয়েকটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করলেও সেসব থেকে কাঙ্ক্ষিত পানি আসছে না। যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শহর এলাকার ৭০ ভাগ পানি সরবরাহ করতে হবে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে আর ৩০ ভাগ পানি সরবরাহ করবে ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎস থেকে। ঢাকার ক্ষেত্রে এই চিত্র উলটো অবস্থায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ওয়াসায় হাজার হাজার কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেসব প্রকল্পের চুক্তি, প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অনেক বিচ্যুতি হয়েছে। এজন্য সেসব প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে ঢাকায় পানি সংকট বাড়ছে।

তিনি আরও জানান, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে এখন রাজধানীবাসীর পানির চাহিদা ৩২৫ কোটি লিটার। আর পানির উৎপাদন সক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি লিটারে অর্থাৎ পানির উৎপাদন ঘাটতি প্রায় ৪৫ কোটি লিটার। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং পাম্প নষ্ট হওয়াসহ নানাবিধ কারণে এসব সংকট তৈরি হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা সেসব সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।