বিদ্যুৎ খাতের লোকসান বাড়ছেই। বেশি দামে কিনে কমে বিক্রির কারণে চলতি বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান হবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) এ লোকসান দাঁড়াবে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকায়। লোকসানের এই অর্থ ভর্তুকি হিসাবে দিতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের আদানি গ্রুপ এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বাড়তি ব্যয় ভর্তুকি হিসাবে দেওয়ার প্রস্তাব বৃহস্পতিবার অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা কমিটি।
মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় এ খাতে মারাত্মক লোকসান হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকার বিদ্যুতের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রেখেছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে এবার বিদ্যুতের জন্য ভর্তুকি লাগবে আরও ১৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আদানি, ভারত-নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ এবং পিডিবির কেন্দ্রসহ ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো ভর্তুকির আওতামুক্ত। সেগুলোকে ভর্তুকির আওতায় আনা দরকার। দেশের সব কেন্দ্র ভর্তুকির আওতায় এলে বিদ্যুৎ খাতে ভতুর্কির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় করে পিডিবি। এর মধ্যে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন পেয়েছে, শুধু সেগুলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। এ হিসাবে দেশের ১৫০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৫৬টি এখনো অনুমোদনের বাইরে। বৃহস্পতিবারের মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই ৫৬টি কেন্দ্রকে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব ওঠে। তবে এর মধ্যে কতটি অনুমোদন করা হয়েছে, অর্থ বিভাগ থেকে তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে সরকারি, আদানি, ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বাড়তি মূল্য ভর্তুকি হিসাবে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। পিডিবি জানিয়েছে, গ্রাহকদের কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয় ৭ টাকায়। কিন্তু পিডিবিকে তা কিনতে হয় ১৩ টাকায়। বাকি টাকা ভর্তুকি হিসাবে দেওয়া হয় অর্থ বিভাগ থেকে।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান কমাতে দুদিন আগে প্রতি ইউনিটের দাম এক থেকে দেড় টাকা বাড়াতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসিতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সেই প্রস্তাবের ওপর শুনানি হবে ২০ ও ২১ এপ্রিল। সরকার জুন থেকে গ্রাহকদের কাছে বাড়তি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে চায়। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা বাড়ালে পিডিবির আয় বাড়বে ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও সরকারের লোকসান তেমন একটা কমবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ ভর্তুকি আদায়ের প্রস্তাবের বিষয়ে মন্ত্রিসভা কমিটিকে জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরে পিডিবির লোকসান হবে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য লাগবে ৪২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। শুধু আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ কিনতেই ভর্তুকি দিতে হবে (সব কেন্দ্রের মধ্যে) সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮২১ কোটি ২০ লাখ টাকা। আদানির বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য প্রতি ইউনিট গড়ে ১৪ টাকা ৩৪ পয়সা। এরপর পায়রা, রামপাল ও নরেনকো ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তিন কেন্দ্রের প্রতিটিকে এক বছরে ভর্তুকি দিতে হবে ৬ হাজার ২৬০ কোটি থেকে ৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এর বাইরে পিডিবির ৩৮টি এবং অন্যান্য সরকারি ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এক বছরে ভর্তুকি দরকার হবে ১২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।
পিডিবি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে আগে প্রতি ইউনিট গ্যাস বিক্রি করা হতো ৫ দশমিক ০২ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫ দশমিক ৫০ টাকা। একইভাবে আগে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েল বিক্রি হতো ৭০ দশমিক ১০ টাকায়, এখন এই তেল বিক্রি করে ৯৪ দশমিক ৬৯ টাকায়। বছর বছর লোকসানের কারণে পিডিবি এখন দেনার ভারে জর্জরিত। তাদের কাছে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির পাওনা ৪২ হাজার কোটি টাকা।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা হচ্ছে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে এ বছর পিডিবি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো। গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে গরমে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না পিডিবি।