Image description

নারায়ণগঞ্জে একদল কিশোর গ্যাং সদস্যের মনে জেল খাটার অদ্ভুত শখ জাগে। যেই ভাবনা সেই কাজ। ১১ বছরের শিশু হোসাইনকে দেখে টার্গেট করে তারা। বিকৃত কৌতূহলে হোসাইনকে নিজেদের আড্ডাখানায় নিয়ে ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অথচ যে কিশোরদের রক্ত দেখলে ভয় পাওয়ার কথা, তাদের মনে জেল খাটার শখ থেকে হত্যাকাণ্ড। যা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো সমাজ ব্যবস্থাকেই।

গত ৩০ এপ্রিল ইতালির লেইজ শহরে পারিবারিক দ্বন্দ্বে বড় ভাইয়ের হাতে খুন হয় নয়ন শেখ নামে এক যুবক। পরবাসে ছোট ভাইকে খুন করে পরিবারের সদস্যদের ভিডিও কলে দেখান হুমায়ুন। এতে তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী পশ্চিম সোনারং গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। গত ২০ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে লৌহজং নদীর পারে পুঁতে রাখা বস্তাবন্দি এক নারী ও নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনা নিয়ে সমাজমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও ঘৃণা দেখা গেছে।

শুধু এই তিনটি ঘটনাই নয়, রোমহর্ষক এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। সন্তান কান্না করায় শ্বাসরোধে হত্যা করা হচ্ছে, পরকীয়ার জেরে হত্যা করা হচ্ছে স্ত্রী-স্বামী-সন্তানকে, শিক্ষকের কাছে ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে সন্তানতুল্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, চিরকুটে শিক্ষকের নাম লিখে আত্মহত্যা করছে ছাত্রী, বৃদ্ধ বাবার মৃত্যুর পর লাশ পচে গন্ধ বের হলেও খোঁজ নিচ্ছে না সন্তানরা, সম্পত্তির লোভে ভাইয়ের হাতে খুন হচ্ছে ভাই, প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে নিজের সন্তানকে, হত্যা ধামাচাপা দিতে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে লাশ- এমন বীভৎস, হৃদয়বিদারক ঘটনা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। সমাজমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে সব জায়গায় বিকৃত মানসিকতার রোমহর্ষক খবরে সয়লাব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক অশান্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। এ ছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, মাদকের বিস্তার এবং যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তরের ফলে এই সমস্যা আরও তীব্র হচ্ছে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা না পাওয়া, ইন্টারনেট ও সমাজমাধ্যমের অপব্যবহার, মাদকের সহজলভ্যতা, পরিবারে ও সমাজে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পারিবারিক অর্থের টানাপোড়েন দ্বন্দ্বে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে অনেকের মধ্যে মানসিকতার বিকৃত রূপ দেখা দিচ্ছে, যা তাকে রোমহর্ষক খুনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনৈতিক সম্পর্ক ও সম্পত্তি ভাগাভাগির বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা সমাজের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে।

মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে পরিবারে একাধিক পক্ষ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এতে করে রোমহর্ষক হত্যা বা আক্রমণ করা মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়াও পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব, ঘটনা ঘটলে দৃশ্যমান বিচারের ঘাটতি, পারিবারিক শিক্ষা না পাওয়ার প্রতিফলন বর্তমান সমাজে ঘটছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন মানুষ এমনিতেই ভয়ংকর ব্যক্তিত্বের হয় না। যখন অনেক ক্ষোভ একসঙ্গে যুক্ত হয় তখনই রোমহর্ষক ঘটনা ঘটায়। এর পেছনে স্কুল, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় রয়েছে। সর্বোপরি শিশুর শৈশব থেকে শুরু করে তার পরিণত বয়সে ব্যক্তিত্ব বিকাশের জায়গায় যদি কোনো অসামঞ্জ্যতা তৈরি হয়, তখনই মানুষের ভিতরে এই ধরনের হিস্রতা, বীভৎসতা তৈরি হতে পারে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ বলেন, সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা থেকে উত্তোরণের পথ নিয়ে সব সময় আলোচনা হয়। এটা কখনো বাড়ে, আবার কখনো কমে। একটা শিশু ভালো, নাকি খারাপ হবে সেটি নির্ভর করে পরিবার ও সমাজের ওপর।

কেউ যদি খারাপ হয়ে যায়, তখন উচিত হবে দ্রুত মামলা নেওয়া, সঠিক তদন্ত করা এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। এ ছাড়াও শিশুদের সঠিক পথে রাখতে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা রয়েছে।