নাগরিকদের সংবেদনশীল কল ডিটেইলস ও জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য বিক্রির অভিযোগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. আরমান হোসেনকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। গত ৫ মে ঢাকা রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তরা করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)।
গ্রেপ্তার মো. আরমান হোসেন অ্যাপ ও ওয়েব ডেভেলপার। তিনি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পার রামরামপুর ইউনিয়নের উত্তর রহিমপুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, আরমান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ছাত্র।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৯ অক্টোবর সিআইডি সদর দপ্তরের সাইবার পুলিশ সেন্টারের অধীন সাইবার মনিটরিং সেলের নিয়মিত অনলাইন মনিটরিংকালে ‘Siam Howlader’ নামক একটি ফেসবুক আইডি নজরে আসে। যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের পূর্ণাঙ্গ ডেটা, এসএমএস তালিকা, বিকাশ-রকেট-নগদসহ বিভিন্ন এমএফএস অ্যাকাউন্টের তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং মামলা সংক্রান্ত তথ্যসহ দেশের নাগরিকদের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য অর্থের বিনিময়ে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিআইডি অনুসন্ধান শুরু করে।
অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ১৩ অক্টোবর রাতে লক্ষ্মীপুরের অভিযান চালিয়ে কমলনগর থানা এলাকা থেকে মো. সিয়াম হাওলাদারকে (২৩) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিমকার্ড, হার্ডডিস্ক ও অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়। তার স্মার্টফোনে ‘সব এখানে’ (Sob Akhane) নামক একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ পাওয়া যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ‘সব এখানে’ অ্যাপ এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রির কথা স্বীকার করেন।
এদিকে সিয়ামকে গ্রেপ্তারের পর ১৪ অক্টোবর সিআইডির উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে সিয়ামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৮ অক্টোবর খুলনার কয়রা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের অন্যতম অ্যাডমিন মো. আল আমিনকে (২৩)। আল আমিন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জানান, তিনি শুধু বিপণন দেখতেন, কিন্তু এই পুরো সিস্টেম এবং অ্যাপটি তৈরি করেছে এক দক্ষ প্রোগ্রামার।
পুলিশের তথ্য বলছে, পরবর্তীতে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ৫ মে সাইবার পুলিশ সেন্টারের একটি আভিযানিক দল ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপার মো. আরমান হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার কাছ থেকে ৩টি মোবাইল ফোন, ৬টি সিমকার্ড (যার মধ্যে ৩টি বিকাশ মার্চেন্ট সিম) এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আরমান প্রোগ্রামিং এবং ওয়েব ডেভেলপিংয়ের কাজে খুবই দক্ষ। এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পূর্বে গ্রেপ্তারকৃত আসামি মো. আল আমিনের নির্দেশনা অনুসারে sobakhane.xyz, sobakhane.online, sobakhane.info নামের ওয়েবসাইটগুলো তৈরি করেন। পরবর্তীতে ‘সব এখানে’ নামক অ্যাপ তৈরি করে এই চক্রের অন্যান্য আসামিদের সহযোগিতায় দেশের নাগরিকদের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা গেছে, ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকদের গোপন সংবেদনশীল যে সকল তথ্য বিক্রি করা হয় সেগুলো জাতীয় গোপনীয় ডাটাবেজ থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়। একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ সকল সংবেদনশীল তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করে। এই চক্রের কয়েকজনের সাথে আসামির হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডি বলছে, আরমানকে রিমান্ডের আবেদনসহ বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলাটির পূর্ণ রহস্য উদঘাটন ও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সিআইডি এই ধরনের অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বদ্ধপরিকর এবং সাধারণ জনগণকে এ ধরনের প্রতারণামূলক অনলাইন অফার থেকে সতর্ক থাকার জন্য নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছে।