Image description

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে গুচ্ছগ্রামের বন্দোবস্তকৃতসহ সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় খারিজ (নামজারি) করে দিচ্ছেন কুড়িগ্রাম সদরের সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) আরিফুল ইসলাম। এতে জেলা সদরের আরাজি পলাশবাড়ি মৌজার অন্তত ৭২ একর সরকারি খাস জমি বেহাত হওয়ার পাশাপাশি গুচ্ছগ্রামের শতাধিক পরিবার ভূমিহীন-গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সদরের আরাজি পলাশবাড়ি গুচ্ছগ্রামের সরকারি খাস জমি বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানায় ‘ভ্রমাত্মক রেকর্ডভুক্ত’ হওয়ায় তা সংশোধনের আবেদন করে গুচ্ছগ্রামবাসী। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরএস রেকর্ড সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জমির (এসএ ২০০১, ২০৭৩ ও ২০২৪ দাগের) সরকারি ভূমি উন্নয়ন করসহ যাবতীয় কার্যক্রম এসএ রেকর্ড মোতাবেক চলমান রাখতে সদর এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু এই নির্দেশনা অমান্য করে একর একর সরকারি খাস জমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করে দিচ্ছেন এসিল্যান্ড।

গুচ্ছগ্রামবাসীর অভিযোগ, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এসিল্যান্ড ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার এবং সদর ভূমি অফিসের একাধিক কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি স্বার্থবিরোধী এই তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। অনুসন্ধানে সরকারি খাস জমি ব্যক্তিমালিকানায় খারিজ করে দেওয়ার সত্যতাও পাওয়া গেছে।

সরকারের মহৎ উদ্যোগ নিয়ে চক্রান্ত

অনুসন্ধান ও জেলা প্রশাসনের আরএম শাখা সূত্রে জানা গেছে, আরাজি পলাশবাড়ি মৌজার এসএ দাগ ২০০১, ২০৭৩ এবং ২০৭৪ এর নিষ্কন্টক খাস জমিতে সরকারি উদ্যোগে গুচ্ছগ্রাম আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। ১৯৮৯ সালে রেজিস্ট্রিকৃত কবুুলিয়াত মূলে ১৫ টি ভূমিহীন-গৃহহীন হতদরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে দুটি ব্যারাকে ২০টি পরিবার এবং ২০২১ সালে পাকা ঘর নির্মাণ করে দিয়ে আরও ২৪টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করে সরকার। এসব পরিবারের মধ্যে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন। এ ছাড়াও ২০০৯ সালে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবিকে ওই মৌজায় (এস.এ দাগ ২০৭৪)  ১ একর খাস জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে দিয়ে বন্দোবস্ত দেয় সরকার। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি শুরু থেকেই সরকারি এসব মহৎ উদ্যোগকে নস্যাৎ করতে চক্রান্ত শুরু করে।

 

একটি চক্র ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে পরিকল্পিতভাবে সরকারি এসব খাস জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিভিন্ন খতিয়ানে ‘ভ্রমাত্মক রেকর্ডভুক্ত’ করে। এরপর তারা গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত বাসিন্দাদের উচ্ছেদের পাঁয়তারা শুরু করে। গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন জানান। কিন্তু তারপরও থেমে নেই ষড়যন্ত্র। খোদ ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ষড়যন্ত্রে রসদ দিচ্ছেন বলে প্রমাণ মিলছে।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি

এসব তথ্য উল্লেখ করে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে জেলা প্রশাসন লিখিত পত্রের মাধ্যমে আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জমির সরকারি ভূমি উন্নয়ন করসহ যাবতীয় কার্যক্রম এসএ রেকর্ড মোতাবেক চলমান রাখার জন্য সদর এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেয়। কিছুদিন নির্দেশনা অনুসরণ করা হলেও ২০২৪ সালের মে মাসে বর্তমান এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম যোগদানের পর ফের বিপত্তি ঘটে। তিনি গুচ্ছগ্রামের খাস জমি আরএস রেকর্ড অনুযায়ী ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করা শুরু করেন। নিরুপায় হয়ে গুচ্ছগ্রামবাসী ফের জেলা প্রশাসনের কাছে যান। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে একই নির্দেশ জারি করে এসিল্যান্ডকে চিঠি দেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করে দিচ্ছেন এসিল্যান্ড।

অনুসন্ধানে এসিল্যান্ডের এমন তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানায় খারিজকৃত প্রায় পৌনে ৩ একর খাস জমির ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের প্রমাণক এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। তাতে দেখা গেছে, নির্দেশনা অমান্য করে আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার এস.এ ২০০১ ও ২০৭৪ দাগের একাধিক খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করে দিয়েছেন এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। এ অবস্থায় বন্দোবস্তকৃত জমি ও বাসস্থান হারানোসহ উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটছে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের। একইসঙ্গে সরকারের আর্থিক ক্ষতিসহ প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

যা বলছেন গুচ্ছগ্রামবাসী

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর আজিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার যখন জমি দিছে তখন ছিল খাল-পাগার। ভরাট করি বসবাস শুরু করছি। এলা এসিল্যান্ড অন্য জনকে জমি দিবার লাগছে।’

আরেক বাসিন্দা ফারুক বলেন, ‘ডিসি অফিসের নির্দেশনার পর জমির খাজনা দিতে গেছি। এসএ অনুযায়ী খাজনা নিচ্ছে না। শুনতেছি তলে তলে টাকা নিয়ে সরকারি জমি অন্যদের দিয়ে দিচ্ছেন এসিল্যান্ড।’

গুচ্ছগ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা হাছেন আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন কেউ নাই যে আমাদের দেখবে। সরকার জমি দিছে, ঘর দিছে। বন্দোবস্ত দেওয়া খাস জমি কীভাবে অন্যদের দিলো, এই প্রশ্ন আমাদেরও।’ একই প্রশ্ন রাখেন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার।

নির্দেশনা মানতে নারাজ তহশিলদার ও এসিল্যান্ড

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পৌর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আব্দুল হাকিম শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিঠির বিষয়ে আমার জানা নেই। প্রয়োজনে নামজারি বাতিল করা হবে।’ 

তবে দুই দিন পর তিনি তার পূর্বের বক্তব্য থেকে সরে এসে বলেন, ‘আরএস গেজেট হওয়ার পর এসএ অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়ার সুযোগ নেই।’

এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আরএস রেকর্ড অনুযায়ী নামজারি করা হচ্ছে। নামজারি করার সময় আমরা এসএ রেকর্ড দেখি। সেখানে সরকারি স্বার্থ থাকলে নামজারি স্থগিত রাখা হয়।’ এরপরও কীভাবে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।

নির্দেশনা না মানা প্রসঙ্গে এসিল্যান্ড বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের এমন চিঠি আমি পাইনি। পেলেও বিধিসম্মত নয় জানিয়ে উত্তর লিখতাম। আরএস গেজেট হওয়ার পর এসএ অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।’
যদিও খোদ সরকার আরএস রেকর্ড হওয়ার পর এসএ রেকর্ড অনুযায়ী খাস জমিতে গুচ্ছগ্রাম গড়ে তোলে।

‘অসদাচরণ’ করেছেন এসিল্যান্ড

আইনজীবীরা বলছেন, জেলা প্রশাসন তথা ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম ‘অসদাচরণ’ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি রাষ্ট্রের স্বার্থহানি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে এসিল্যান্ড অসদাচরণ করেছেন। সরকার তাকে দায়িত্বে বসিয়েছে রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ রক্ষার জন্য। কিন্তু তিনি স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আরএস রেকর্ড হলেও জমিতে সরকারি স্বার্থ থাকলে নামজারি স্থগিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা উচিত।’ একইসঙ্গে সরকার পক্ষ এবং বন্দোবস্ত পাওয়া ব্যক্তিদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন এই আইনজীবী।