দেশে চলমান সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলেমিশে এবং সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন শেষে এমন বার্তা নিয়ে কর্মস্থলে ফিরছেন তারা। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার পরামর্শও পেয়েছেন ডিসিরা।
বিএনপির সরকার গঠনের পর এটি ছিল প্রথম ডিসি সম্মেলন। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করা, প্রশাসনকে আরও কার্যকর, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদক, কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাস দমনে প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে মাঠ প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করা হয়।
ডিসি সম্মেলন শুরু হয় গত ৩ মে। চার দিনের সম্মেলনে ২৮টি কর্ম-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিন সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়াও রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ও প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তারা।
গতকাল বুধবার রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন ডিসিরা। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেষ দিন সম্মেলনের প্রতিক্রিয়া ও মূল্যায়ন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
এবারের সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা ৪৯৮টি প্রস্তাব পেশ করেন। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পৃথক কর্ম-অধিবেশনগুলোয় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
সম্মেলনের প্রথম দিন রাজনীতিকদের সমন্বয়ে জেলা পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি বৈঠক নিয়মিত করার তাগিদ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এ বৈঠকের মূল লক্ষ্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়; মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির মাধ্যমে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। সম্মেলনে ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা গত কয়েক বছরের মতো এবারও বিচারিক ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন। তবে এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
মাঠ প্রশাসনে ভালোভাবে কাজ করতে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে– প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণপূর্বক প্রতিরোধ ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা পরিহার করে দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়। সব উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে গুণগত মান নিশ্চিতকল্পে কার্যকর তদারকি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে অনুসরণ করতে হবে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে সততা, মেধা ও দক্ষতাকে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রশাসন ও নির্বাচিত সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করে কীভাবে কার্যকর এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়েও অধিবেশনে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকদের কাছে আমরা একটি জিনিস চেয়েছি– দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে তারা যেন নজরদারি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখেন।
ওই দিন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে ডিসিদের কার্যকর ভূমিকার ওপর। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও প্রস্তাবনা শুনে সমাধানের উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
সম্মেলনের তৃতীয় দিন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করেন ডিসিরা। এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া সমকালকে বলেন, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিসিরা মিলেমিশে কাজ করলে সব সমস্যা সহজেই সমাধান করা যাবে। এবার যে ডিসি-এসপিদের সমন্বয়ে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি বৈঠক প্রতি মাসে হওয়ার কথা বলা হয়েছে, এটা ভালো উদ্যোগ। এতে বিচারপ্রার্থী জনগণ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়, সেগুলো ওঠে আসবে। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি বৈঠক হলো মামলা-মোকদ্দমার বিষয়। এখানে রাজনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করলে তদন্তে প্রভাব পড়তে পারে। এই বৈঠকে বাইরের লোক যুক্ত না করাই ভালো।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তৎপর হওয়ার নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সম্মেলনের শেষ দিন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জেলা প্রশাসকদের আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ইস্যু করা প্রায় ১০ হাজার লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র এখনও জমা পড়েনি। সেসব অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করার জন্য ডিসিদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনের শেষ দিনের তৃতীয় অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা দেওয়ার যে নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল, তা পার হওয়ার পরও একটি বড় অংশের অস্ত্র এখনও মাঠ পর্যায়ে রয়ে গেছে। এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনে মামলা করার জন্য মাঠ প্রশাসনকে তৎপর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নেওয়া কার্যক্রম বাস্তবায়ন
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, মন্ত্রণালয়ের নেওয়া কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবেন ডিসিরা। সে ব্যাপারে তাদের পূর্ণ উদ্যমে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল মন্ত্রী বলেন, আমাদের জেলা পরিষদ অতটা সক্রিয় বা শক্তিশালী নয়। আমাদের মূল চাবিকাঠি এখনও জেলা প্রশাসক। তাই তাদের সঙ্গে এমন একটা সংযোগ দরকার, যাতে আমরা যে কার্যক্রম হাতে নিই, তা সহজেই বাস্তবায়ন করা যায়।
গণমাধ্যমকে ডিজিটাল বাস্তবতার উপযোগী করতে হবে
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণমাধ্যমের সমস্যাটা অনেক ব্যাপক। এটি একটি পুরোনো অ্যানালগ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে গতকাল তিনি জেলা প্রশাসকদেরও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, অনলাইন ও ডিজিটাল গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের কারণে সাংবাদিকতায় সুস্পষ্ট নীতিমালা ও আচরণবিধি প্রয়োজন।
দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের সহযোগিতার আহ্বান
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জেলা পর্যায়ে সবখানে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রচারাভিযানের জন্য ডিসিদের সহযোগিতা চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সম্মেলনের শেষ দিনে ডিসিদের সঙ্গে অধিবেশন শেষে দুদকের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
তিনি বলেন, দুদকের বর্তমান কাঠামোতে আমরা যে কাজগুলো করছি, সে সম্পর্কে জেলা প্রশাসকদের ধারণা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক যে কাজগুলো আছে, সেখানে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা রয়েছে।