Image description
১৭ মে মতামতের জন্য আলোচনার প্রস্তুতি

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করেনি বর্তমান সরকার। তাড়াহুড়া করে তৈরি করা ওই অধ্যাদেশে নানা ত্রুটি, অস্পষ্টতা ও সাংঘর্ষিক বিষয় থাকায় বর্তমান সরকার অধ্যাদেশটির প্রতি আগ্রহ হারায়। এ অবস্থায় আরও যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে গত ৯ এপ্রিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ সংসদে পাস করা হয়। ফের চালু করা হয় ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইনটি। এই সিদ্ধান্তের এক মাসের মধ্যেই নতুন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাতিলকৃত অধ্যাদেশকে সামনে রেখে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে খসড়া প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। খসড়া আইনটির ওপর আগামী ১৭ মে অংশীজনের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণে আলোচনা সভার প্রস্তুতি চলছে। রাজধানীতে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের যেসব অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল হিসেবে আনা হয়, সেই বিলগুলোর প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে কারণ উল্লেখ করা হয়। এসব অধ্যাদেশের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আরও পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বিলেই উল্লেখ করা হয়েছিল। মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কিছু ধারা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে তদন্ত, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব ছিল। আমরা আরও যাচাই-বাছাই করে সবার মতামত নিয়ে গ্রহণযোগ্য একটি আইন করতে চাই। এ কারণে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছি।’

প্রথমবারের মতো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাস করা হয় ২০০৯ সালে। আইনটির নানা দুর্বলতা নিয়ে সব মহলে আলোচনা ছিল। সে কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনটি শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেয় এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে। ২০০৯ সালের আইনে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাই কমিটিতে সরকারি দলের প্রাধান্য ছিল। বাছাই কমিটি ছিল স্পিকারের সভাপতিত্বে। কমিটিতে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সদস্য থাকার বিধান আছে। নিয়োগের জন্য রাজনীতিবিদ ও আমলানির্ভর এই বাছাই কমিটিতে পরিবর্তন এনেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

অধ্যাদেশে বলা ছিল, বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্যদের মধ্যে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য, বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি, একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তবে ওই বাছাই কমিটিতে কোনো মানবাধিকার কর্মীর স্থান ছিল না। এ কারণে নতুন আইনে বাছাই কমিটিতে পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে সরকার। আবার বাছাই কমিটি নিয়োগযোগ্য চেয়ারপারসন বা কমিশনারের প্রতিটি পদের বিপরীতে একজন প্রার্থীর নামসহ একটি তালিকা সুপারিশ আকারে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে মর্মে অধ্যাদেশে বিধান রাখা ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি পদের বিপরীতে একজনের নাম সুপারিশ করা হলে তা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, সেটি আর সুপারিশ থাকে না। সেজন্য সরকার নতুন আইনে এ জায়গায়ও পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে।

জানা গেছে, অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকেই ‘গুম কমিশন’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। গুমের তদন্ত মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার পৃথক গুম আইন করলেও তাতে আলাদা ‘গুম কমিশন’ গঠনের কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো রাখেনি। আবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনেও গুমের বিচার ও তদন্তের কথা বলা হয়েছে। গুমের মতো স্পর্শকাতর ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের সক্ষমতার বিষয়টি মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে উল্লেখ ছিল না। অধ্যাদেশে এসব বিষয়ে নানা অস্পষ্টতার কারণে মানবাধিকার কমিশনকে গুমের অপরাধ তদন্তের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে তা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

২০০৯ সালের আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি উল্লেখ করা ছিল। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো দরখাস্তের ভিত্তিতে সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয় কমিশনকে। সেখানে তদন্তের বিষয়ে বলা হয়, কোনো অভিযোগ পেলে বা গণমাধ্যমসহ অন্য যে কোনো মাধ্যম থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন-সম্পর্কিত তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। কমিশনের যে কোনো কমিশনার, কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তদন্ত দলের সদস্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালিত হবে। অধ্যাদেশে কমিশনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা পরিশোধের আদেশ দেওয়া এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে কোনো বিভাগীয়, শৃঙ্খলামূলক বা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা অভিযোগের ভিত্তিতে নিতে পারবে বলা হলেও অভিযোগ নেওয়ার পর কতদিনের মধ্যে তা অনুসন্ধান বা তদন্তে পাঠাতে হবে, সে বিষয়ে অধ্যাদেশে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা উল্লেখ ছিল না। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কত দিনে শেষ হবে, তারও সময়সীমা উল্লেখ ছিল না। তদন্ত শেষে কমিশন জরিমানা, ক্ষতিপূরণ, মামলা করার সুপারিশ বা নিজে বাদী হয়ে মামলা করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে বলা হলেও, এসব ক্ষেত্রে কীভাবে তা কার্যকর হবে, অধ্যাদেশে সে ব্যাপারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। জরিমানা কত টাকা হবে, কীভাবে আদায় হবে, কোন আইনে হবে, তার কোনো গাইডলাইন দেওয়া নেই। সরকার এসব ক্ষেত্রে নতুন আইনে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। যেসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার উল্লেখ নেই, সেসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার চিন্তা করছে। এ ছাড়া অধ্যাদেশে অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তের নামে দুটি ধাপ রাখায় কালক্ষেপণের সুযোগ ছিল। সরকার অনুসন্ধানের ধাপটি বাতিল করে শুধু তদন্তের বিধান করার চিন্তা করছে।

জানা যায়, সংসদ কার্যকর না থাকায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্রপতি এসব অধ্যাদেশ জারি করেন। সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলোকে বৈধতা দিতে হলে সংসদের প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করতে হয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে আইনে রূপান্তর করতে হয়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয় সরকার। গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠকে অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু আগের মতোই পাস করা হয়। ১৩টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাস করা হয়। ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। সেগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। এ ছাড়া ৭টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ-সংক্রান্ত বিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই সাতটির মধ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামের এই বিলটিও রয়েছে।

সংসদে পাস করা ওই বিলে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আরও পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন হওয়ায় ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করা হচ্ছে। বিলের সঙ্গে যুক্ত ‘উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতি’তে বলা হয়, মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং যথাযথভাবে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ১৬ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে তাতে কিছু সংশোধন আনা হয়। এরপর বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ওই আইন রহিত করে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয় এবং পরে ২০২৫ সালের ৭৪ নম্বর অধ্যাদেশ দিয়ে সেই অধ্যাদেশেও সংশোধন আনা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের বিষয়ে অংশীজনের সঙ্গে আরও পরামর্শ গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। সে কারণেই ওই অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করায় সংসদে বিরোধী দলের বিরোধিতার মুখে পড়ে সরকারি দল।

বিরোধিতার জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছিলেন, ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি চূড়ান্তভাবে বাতিল করে পুরোনো কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার জন্য নয়; বরং আরও পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রাখতেই ২০০৯ সালের আইন আপাতত পুনঃপ্রচলন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে এমন কিছু অস্পষ্টতা আছে, যা ভুক্তভোগীর জন্যও নতুন ধরনের ভোগান্তি তৈরি করতে পারে। বিলের শুরুতেই বলা আছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি ‘সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সহিত অধিকতর পরামর্শ যাচাই-বাছাই’ সাপেক্ষ। আর সে অনুযায়ী এরই মধ্যে নতুন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।