বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা চালু করতে বিশেষ সুবিধা দিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরুতে স্বল্পমেয়াদি ৪০ হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিম করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিমালা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবে। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির ভিত্তিতে বিষয়টি সার্কুলার আকারে জারি করা হবে। এ ধরনের বন্ধ কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ২০০-এর বেশি হতে পারে।
জানা যায়, রিফাইন্যান্স স্কিমের স্বল্পমেয়াদি বিশেষ সুবিধার আওতায় বড় শিল্প খাতে ২০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতে ১০ হাজার কোটি এবং কৃষি খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ দেওয়া হবে। স্বল্পমেয়াদি এ সুবিধায় চলতি মূলধন ঋণ হিসাবে দেওয়া হবে। মেয়াদ হবে ১ থেকে দেড় বছর। এ অর্থ পেয়ে কারখানা মালিকরা পুনরায় উৎপাদনে যেতে পারবেন এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানার ক্যাপিটাল মেশিনারি পুনরায় চালু করতে পারবেন।
তবে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কী পরিকল্পনা নেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হলে পরে সেগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করতে কী ধরনের সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর তহবিল গঠন ও নীতিমালা জারি করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে নাকি সরকারি অর্থায়নে এই তহবিল গঠন হবে, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থে এই তহবিল গঠন করতে হলে নতুন করে টাকা ছাপিয়ে করতে হবে। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের কারণে এ স্কিম বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ব্যাংকাররাও রোববারের বৈঠকে এ ধরনের মতামত দিয়েছেন।
জানা যায়, রিফাইন্যান্স স্কিমগুলোর আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কিছুটা বেশি হবে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেটের নিচে থাকবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ এবং পলিসি রেট ১০ শতাংশ। এ হিসাবে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের আশপাশে থাকতে পারে। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে তহবিল পাবে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালুর জন্য নীতিগত সুবিধা দিতে চাচ্ছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ; এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ কারখানাগুলোর জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, বর্তমানে দুই ডজনের বেশি ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে, অনেক ব্যাংকের মূলধনও নেতিবাচক অবস্থায়। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও আশানুরূপ বাড়ছে না। কারণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কম থাকায় উৎপাদনও কমে গেছে। এর ফলে রাজস্ব সংগ্রহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ সরবরাহ করা হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাবে। তিনি সরকারকে দুটি পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রথমত, যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো, সেখান থেকে আংশিকভাবে ফান্ড সংগ্রহ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আসন্ন জাতীয় বাজেট থেকে একটি অংশ এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি ধাপে ধাপে এই স্কিম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই সুবিধা শুধু সেসব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে, যাদের কারখানা দীর্ঘদিন সচল ছিল; কিন্তু কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলার বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্তের পর বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, যেসব কারখানার ক্রয়াদেশ রয়েছে এবং পণ্যের বাজার চাহিদা আছে, তারাই এ তহবিলের সুবিধা পাবে।
সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি এবং ১০০ কোটির নিচে ঋণ রয়েছে-এমন কারখানার তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ধরনের বন্ধ কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ২০০-এর বেশি হতে পারে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ও আংশিক বন্ধ কারখানার তালিকা আলাদাভাবে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানকে কোন সময়ে, কী ধরনের ঋণ দেওয়া হয়েছে-সেসব তথ্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কী ধরনের সুবিধা দিলে কারখানাগুলো সচল হবে, তা জানতে কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।