Image description

দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে আশার আলো নেই। দীর্ঘদিন থেকে এ খাতে যে খরা ছিল, বর্তমানে তা আরও বেড়েছে। আবার ভবিষ্যতের জন্যও নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বড় কয়েকটি সমস্যার মধ্যে রয়েছে-দুর্নীতি, ঋণের উচ্চসুদ, জ্বালানি সংকট, নানা ধরনের করের চাপ, ডলারের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। এই সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার দেশ পরিচালনা করছে। কিন্তু সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পুরো অর্থনীতির শৃঙ্খলা নষ্ট করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে করোনার পর থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা সংকট মোকাবিলা করে আসছে। সর্বশেষ ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে নতুন করে কয়েকটি শঙ্কা যোগ হয়েছে। ফলে চলতি বছর মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং মানুষের আয় কমার কারণে অর্থনীতিতে চাহিদা কমবে। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারও জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ৪ বিলিয়ন ডলার (৫০ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়েছে। প্রতিনিয়ত এই ক্ষতি আরও বাড়ছে। সবকিছু মিলে নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, পুরোনো উদ্যোক্তারাই বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ফলে কর্মসংস্থান ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগে চরম মন্দা চলছে। আর এই মন্দার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়েছে। অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। ইতোমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়ে গেছে দেশ। এ বছরের বাজেটের বিশাল অঙ্কের টাকা ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখতে হবে। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ স্বাভাবিক থাকলে এই সমস্যা হতো না। এছাড়া বিনিয়োগ সংকটের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে, রপ্তানিতে প্রভাব পড়েছে। তবে তার মতে, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণও নেই। কারণ হিসাবে তিনি জানান, ‘দেশে কর অত্যন্ত বেশি। একজন ব্যবসায়ী কিংবা কোম্পানির মালিককে নানা ধরনের ট্যাক্স দিতে হয়। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদেরই আবার চেপে ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দ্বিতীয়ত, এমনিতেই পুঁজির সংকট, এরপর ঋণের সুদ অত্যন্ত বেশি। সুদ কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এই হারে ট্যাক্স এবং ঋণের উচ্চসুদ দিয়ে কে বিনিয়োগ করতে আসবে।’ এভাবে মুনাফা করা সম্ভব কি না-এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এই হারে সুদ ও কর দিয়ে সৎভাবে কেউ ব্যবসা করলে তার লোকসান হবে। আর লোকসান দিতে কেন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন। সরকারও এটি স্বীকার করে।’ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি উত্তরণে যে কোনো মূল্যে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সরকারের লক্ষ্য কর্মসংস্থান বাড়ানো। আর বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন বাজেট জরুরি। অন্যদিকে আয় বাড়াতে সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশের বিনিয়োগের চিত্র তিনটি সূচক থেকে পাওয়া যায়। প্রথমত, বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন বাড়বে। বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণ বাড়বে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে সবগুলোই নেতিবাচক। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বতর্মানে তা কমে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে মূলধনি যন্ত্র এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি দুটিই কমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১১১ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১২৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১৬ কোটি ডলার। একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি ১ হাজার ৪১৫ ডলার থেকে কমে ১ হাজার ৩৮৬ ডলারে নেমেছে। এছাড়া কমে আসছে বেসরকারি বিনিয়োগের নিবন্ধন। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করেছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বৈশ্বিক সংকট সামনে আসে।

এদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনের নাম ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট।’ এতে বলা হয়েছে-বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট ছয়টি খাতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়বে। এর মধ্যে রয়েছে-প্রথমত, আমদানি বাড়বে, কমবে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হবে। এতে চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স) স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। দ্বিতীয়ত, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহণের বৃদ্ধির ফলে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। চতুর্থত, ২০২৬ সালে আরও ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামবে। পঞ্চমত, সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকির বৃদ্ধির ফলে আর্থিক চাপ বাড়বে। সবশেষে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আরও বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া বিশ্বব্যাংক তাদের পূর্বাভাসে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাড়ে ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু গত জানুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের কারণে সেটি আরও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল প্রকাশিত পূর্বাভাসে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসারে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি ৪ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

জানতে চাইলে তৈরি ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) সোমবার যুগান্তরকে বলেন, বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীলতা দরকার। তাই সবাই রাজনৈতিক সরকারের জন্য অপেক্ষা করেছিল। এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে অনেকগুলো সমস্যা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। ঋণের উচ্চসুদ এবং বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের উন্নয়ন বাজেট কমছে। অর্থনীতিতে চাহিদা কমে আসছে। এছাড়া আগামীতে করনীতি কী হবে, সেটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক আছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি নিয়ে আর কেউ চিন্তা করছে না। বরং কীভাবে টিকে থাকা (সারভাইভ করা) যায়, সবাই সে চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা কতটা সুসংহত, তা তিনটি সূচক দিয়ে বোঝা যায়। এগুলো হলো-মূল্যস্ফীতির হার, মুদ্রার বিনিময় হার এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হারের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হবে। তিনটি সূচকই বর্তমানে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার বিষয়টি স্পষ্ট করে। চলতি বছরের বাজেটে সরকারের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু তেলের দাম বাড়ানোর ফলে চলতি মাসে এটি আরও বাড়বে। অন্যদিকে টানা কয়েক মাস ডলারের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এটি আবার বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে সরকারি এলসি রেটেই এক মার্কিন ডলারের দাম ১২৩ টাকা। খোলাবাজারে সেটি প্রায় ১২৭ টাকা। এছাড়া বর্তমানে শিল্প খাতে ঋণের সুদের হার ১৩-১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এরপরও ঋণ মিলছে না। বিনিয়োগের ওপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ তিনটি বিনিময় হারের কোনোটিতেই স্বস্তি নেই।

২৭ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন হামলার আগে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৬৫ ডলার। বর্তমানে তা ১০০ ডলারে উঠেছে। আর বাড়তি দাম সমন্বয় করতে সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, পরিবহণে বাড়তি ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কৃষি ও অন্যান্য শিল্প এবং সেবাসহ অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমছে। এক কথায় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়েছে। বিনিয়োগে এগুলোর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে বাংলাদেশে বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতার পেছনে ছোট-বড় ১৭টি সমস্যা উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবার আগে সামনে এসেছে দুর্নীতি। এছাড়া উল্লেখযোগ্য হলো-প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি এবং ঋণের উচ্চসুদ। কিন্তু এরপরও পুঁজি মিলছে না। রয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, আমলতান্ত্রিক জটিলতা। কিন্তু এর কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি। ফলে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বছরে ২০ লাখ লোক শ্রমবাজারে আসছে। কিন্তু কর্মসংস্থান নেই। একের পর এক বন্ধ হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে কর্মসংস্থানের বাজার আরও সংকুচিত হচ্ছে।