চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও চার মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে একটি রায়ের অপেক্ষায় এবং যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে তিন মামলায়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে করা মামলায় যুক্তিতর্ক চলছে। এ ছাড়া রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলির মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে চার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫৫ জনকে দণ্ড দিয়ে রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে গুম-খুন ও চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের সাড়ে ৪ শতাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনে। এসব অভিযোগ যাচাইবাছাই করে এখন পর্যন্ত ৬৫টি মিস কেস (বিবিধ মামলা) দায়ের করা হয়েছে। এ মামলাগুলোর মধ্যে তদন্ত শেষে ২৬টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য এসেছে। বর্তমানে ২২ মামলার বিচার চলমান রয়েছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, খুব শিগগিরই বেশ কিছু তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হবে। এরপর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
প্রসিকিউশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলমান মামলাগুলোর আসামি ৪৫০ জনের বেশি। এর মধ্যে ১৬০ জন গ্রেপ্তার, ২৯৩ জন পলাতক, জামিন পেয়েছেন একজন এবং মারা গেছেন এক আসামি। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিসহ অন্যান্য বেসামরিক ব্যক্তি ৭৪ জন, পুলিশ সদস্য ৬৫ জন, সেনাবাহিনীর সদস্য ২০ জন ও আনসার সদস্য একজন।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
বিচার শেষের পথে যেসব মামলা : কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ ৮টি অভিযোগের মামলায় একমাত্র আসামি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক চলছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হতে যাচ্ছে। এর পরবর্তী ধাপে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া গণ অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলি করে আহতসহ দুজনকে হত্যা মামলায় যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১-এ এটি এখন রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। মামলার আসামি মোট পাঁচজন। তাদের মধ্যে চারজন পলাতক। পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এই বিচারকাজের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই, বার্তা দিতে চাই, বাংলাদেশে এই জাতীয় ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বিচারের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত চারটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আরও তিন থেকে চারটি মামলা রায় ঘোষণার কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।
চার মামলায় ৫৫ জন দণ্ডিত : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এরই মধ্যে চারটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি অপর আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। মুক্তি পেয়েছেন একজন। প্রথম রায়ে গণ অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১। মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক এই রায়ে শেখ হাসিনা ও কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশের পাশাপাশি শহীদদের পরিবারকে এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় রায়ে গণ অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি এ রায় দেওয়া হয়। তৃতীয় রায়ে গণ অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ অপর একজনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। সেই সঙ্গে আরও সাত আসামিকে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ক্ষমা করে দেওয়া হয় একজনকে। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি এ রায় ঘোষিত হয়।
চতুর্থ রায়ে গণ অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ৯ এপ্রিল ঘোষিত এ রায়ে অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।