বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিং মল ও মার্কেট বন্ধ করা বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে সূর্য ডুবতেই নিভতে শুরু করে শপিং মলের বাতি। ঠিক সেই সময়ে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর ফুটপাত ও অলিগলিতে গভীর রাত পর্যন্ত জ্বলছে লাখ লাখ অবৈধ দোকানের বাতি, যার অধিকাংশই চলছে চোরাই বিদ্যুতে। একই সময়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক খাত প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গ্রিডে তৈরি করছে অদৃশ্য চাপ। বাণিজ্যিক ব্যবহার হলেও এসব ইজিবাইকের চার্জিং স্টেশনগুলো কোথাও চলছে আবাসিক লাইন থেকে, কোথাও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে, কোথাও বাণিজ্যিক মিটার বাইপাস করে।
সরকারের হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে জ্বালানি সংকটে চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াট হলেই জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ কারণেই সন্ধ্যায় শপিং মল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ১১ শতাংশ বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহার হয়। ফলে ৩ ঘণ্টা শপিং মল বন্ধ রেখে বিদ্যুতের আহামরি উন্নতি সম্ভব নয়। উল্টো ব্যবসায়িক ক্ষতি অনেক বেশি হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে প্রয়োজন চুরি ও অবৈধ ব্যবহার ঠেকানো।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলাচল করছে। এগুলো কোনো ধরনের নিবন্ধন বা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় নেই। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাতেই এ সংখ্যা ১০ লাখের বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দ্রুত বর্ধনশীল এ খাতটির জ্বালানি পুরোপুরি বিদ্যুৎনির্ভর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ যানগুলো সাধারণত ৪৮ থেকে ৬০ ভোল্টের লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিতে চলে, যেগুলোর ধারণক্ষমতা গড়ে ৮০ থেকে ১২০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার। প্রতিটি ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ দিতে গড়ে ৫ থেকে ৭ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে দৈনিক যদি ২৫ লাখ যানও চার্জ নেয় তাহলে দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ইউনিটের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব ব্যবহারের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ পুরোনো ব্যাটারি একাধিকবার চার্জ দিতে হয়।
এ বিদ্যুতের বড় অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ও প্রায় অবৈধ উপায়ে। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযানে রাজধানীতে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট শনাক্ত হয়, যার কিছু আবাসিক সংযোগ থেকে, কিছু সরাসরি অবৈধ লাইন টেনে, কিছু বাণিজ্যিক মিটার বাইপাস করে চালানো হচ্ছিল। সম্প্রতি আগারগাঁও ফিল্ম আর্কাইভের পাশে রাস্তার ওপরে এমন চার্জিং পয়েন্ট দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ইজিবাইক চার্জিং ঘিরে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের লোড পূর্বাভাসে এ খাতের বড় অংশই ধরা পড়ে না। ফলে হঠাৎ লোড বেড়ে যায়, যা লোডশেডিং বাড়িয়ে দেয়।
ইজিবাইক খাতের পাশাপাশি আরেকটি বড় কিন্তু অনানুষ্ঠানিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গোষ্ঠী হলো ফুটপাতের দোকান। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়ামহল্লা-সবখানেই সন্ধ্যার পর জমে ওঠে অস্থায়ী দোকানপাট। এদের অধিকাংশেরই কোনো বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। কেউ পাশের ভবন থেকে লাইন টেনে নেয়, কেউ ব্যাটারি চার্জ করে এনে ডিসি লাইট জ্বালায়। সন্ধ্যা ৭টার পর যেখানে শপিং মলগুলো বন্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, সেখানে ফুটপাতের এসব দোকান ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সচল থাকছে।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে শপিং মল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার দাবি জানিয়েছে ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এফইএবি)। তাদের দাবি, শপিং মলের প্রায় ৬০ শতাংশ বিক্রি হয় সন্ধ্যার পর। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিং মল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এ ছাড়া ফুটপাত, পাড়ামহল্লার দোকান, রেস্টুরেন্ট, খোলা বাজার ও অস্থায়ী মেলা রাত পর্যন্ত খোলা থাকলেও শপিং মলের ক্ষেত্রে আলাদা সময়সীমা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে।
বিভিন্ন জরিপ, দোকান মালিক সমিতির বক্তব্য ও উচ্ছেদের তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় ফুটপাতে অন্তত সাড়ে ৩ লাখ দোকান আছে বলে মনে করা হয়। প্রতিটা দোকানে ১০ ওয়াট থেকে ৬০ ওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। গড় ৪০ ওয়াট ধরলে প্রতিদিন শুধু সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় প্রায় ৭০ হাজার ইউনিট। সারা দেশের বড় শহরের ফুটপাতের দোকানের হিসাব ধরলে হিসাবটা দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই লাখ ইউনিটে, যার অধিকাংশই অবৈধ সংযোগে চলছে।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ঈদের আগে সন্ধ্যায় শপিং মল বন্ধ করে যতটা না বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তার চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি বেশি হবে। সারা দেশে বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার মাত্র ১১ শতাংশ। ৫৭ ভাগ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় আবাসিকে। অনেকে আবাসিক লাইন নিয়ে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করে। ইজিবাইক চার্জিংও আবাসিকে ঢুকে গেছে। এ খাতে ছোট উদ্যোগ বড় প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকটের একটি বড় কারণ হলো ‘অদৃশ্য লোড’-যা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয় না। একদিকে বৈধ খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
ইজাজ হোসেনের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন ইজিবাইক খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা। নিবন্ধন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং স্টেশন এবং আলাদা ট্যারিফ চালু করা। অতিরিক্ত ব্যাটারি ও সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপন। পাশাপাশি ফুটপাতের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সমন্বিত অভিযান এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।