কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই, কোনো আইনও নেই, তবু ঢাকঢোল পিটিয়ে রাস্তায় হকার বসানো হচ্ছে। হকারদের কার্ড দেওয়া হচ্ছে, বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। বিশেষ করে গুলিস্তান এলাকায় সম্প্রতি হকারদের উচ্ছেদ করার পর অবৈধভাবে এ কাজ করা হচ্ছে। নগরবিদরা বলছেন, এভাবে পরিকল্পনাহীনভাবে হকার বসার অনুমতি দিলে নগরজীবনে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
জানা গেছে, গুলিস্তানসহ রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আগে অবস্থান করা হকারদের সম্প্রতি উচ্ছেদ করা হয়। এরপর তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ হিসেবে গুলিস্তানের রমনা ভবনসংলগ্ন লিংক রোড এলাকায় সাদা দাগ কেটে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এসব নির্ধারিত স্থানে হকাররা ‘হকার কার্ড’-এর মাধ্যমে বসার অনুমতি পাচ্ছেন। তবে এ প্রক্রিয়ার কোনো বৈধতা বা প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হকার কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। কারা এই কার্ড পাচ্ছেন, কীভাবে নির্বাচন করা হচ্ছে কিংবা এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে- এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানীতে হকার সমস্যা দীর্ঘদিনের। তারা যেখানে-সেখানে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে দোকান বসানোর কারণে পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এর পাশাপাশি যানজটও তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের মূল দায়িত্ব হলো নগরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনো নীতিমালা ছাড়াই রাস্তায় হকার বসার অনুমতি দেওয়া এ দায়িত্বের পরিপন্থি। তাদের মতে, রাস্তাঘাট জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত, ব্যবসার জন্য নয়। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নগর ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘যখন কোনো সংস্থা নিজেই নিয়ম ভেঙে অনিয়মকে বৈধতা দেয়, তখন তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আজ যদি টাকার বিনিময়ে হকার বসার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের সরানো আরও কঠিন হবে।’ এদিকে পথচারীরা বলছেন, হকারদের কারণে ফুটপাত ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গুলিস্তান, মতিঝিলসহ ব্যস্ত এলাকাগুলোতে হাঁটার মতো জায়গা নেই বললেই চলে। তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে হকারদের একটি অংশ বলছে, জীবিকার তাগিদেই তারা রাস্তায় বসতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের দাবি, সিটি করপোরেশন যদি নির্দিষ্ট ও বৈধ কোনো স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে, তাহলে তারা সেখানেই ব্যবসা করতে আগ্রহী।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হকার সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। এজন্য নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি, লাইসেন্স প্রদান, সময়ভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগও প্রয়োজন। সার্বিকভাবে বলা যায়, নীতিমালা ছাড়া হকার বসার অনুমতি দেওয়া হলে তা নগরের শৃঙ্খলা ভেঙে দিতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সমস্যার টেকসই সমাধান করা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।