সুনামগঞ্জের দেখার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকার বোরো চাষিরা এখন দ্বিমুখী সংকটে বিপাকে পড়েছেন। একদিকে অকাল বন্যায় ধান তলিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য খড় পচে যাওয়ায় তারা দিশেহারা। দীর্ঘ দশ দিন পর বুধবার কড়া রোদের দেখা মিললেও বিকেলে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হতেই কৃষকদের মধ্যে ধান ও পচা খড় শুকানোর হিড়িক পড়ে যায়। খড় পচে কাদা হয়ে যাওয়ায় সারা বছর গবাদিপশু কী খাবে—সেই দুশ্চিন্তায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে তাদের গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। সুনামগঞ্জ সদর ও মধ্যনগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় নৌকা বোঝাই করে গরু বাজারে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেখার হাওরপারের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মাসুক মিয়া জানান, তার এক একর ৫৬ শতক জমির মধ্যে এক একর কাটতে পারলেও সব খড় পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ছয়টি গরুর মধ্যে ৬০ হাজার টাকা দামের গরু মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন এবং বাকিগুলোও বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল অদুদ তার নয়টি গরুর মধ্যে দুই লাখ টাকা মূল্যের চারটি গরু মাত্র এক লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।
কিষাণি জমিলা খাতুনের ভাষ্য, গরু তো আর ধান খাবে না, তাই সারা বছর কী খাওয়াবেন সেই চিন্তায় সবাই গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইসলাম উদ্দিন নামের আরেক কৃষক তিন একর জমির খড় নষ্ট হওয়ায় আক্ষেপ করে বললেন, এই পচা খড় গরু মুখেও নেবে না, তবুও নিরুপায় হয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশারও নিশ্চিত করেছেন, হাওরপারের অনেক কৃষক সারা বছরের খোরাকি জোগাড়ের দুশ্চিন্তায় কম দামে গরু ছেড়ে দিচ্ছেন।
উন্নয়নকর্মী শাহ কামাল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানান, অনেক কৃষকই তাকে বলেছেন গরু বাঁচানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাষাবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ গবাদিপশু হারিয়ে কৃষকরা আগামী মৌসুমে কীভাবে চাষ করবেন তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার দাবি, সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় ভালো দাম পাওয়ার আশায় অনেক কৃষক আগেভাগে গরু বাজারে তুলছেন এবং জেলাজুড়ে এখনো পশুখাদ্যের কোনো বড় সংকট তৈরি হয়নি।
তার দেওয়া তথ্য মতে জেলার ১২টি উপজেলায় বর্তমানে ৫ লাখ ৪০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। সরকারি আশ্বাসের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, খড়ের তীব্র অভাব ও আর্থিক সংকট সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।