মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে সমন্বয়ের অভাবে এপ্রিলে দেশের মূল্যস্ফীতির হার আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই পণ্যের দাম বাড়ায় এক মাসের ব্যবধানে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি, যা আরেক দফায় চাপ বাড়ালো সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। এতে অস্বস্তিতে পড়েছে তারা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য সহ সকল দ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কার কথা আগেই বলেছিলেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। তবে গত ২০শে এপ্রিল জ্বালানির দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে না বলে জাতীয় সংসদে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বুধবার মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এতে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশ, যা আগের মাস মার্চে ছিল ৮.৭১ শতাংশ। গত বছরের একই মাসে এই হার ছিল ৯.১৭ শতাংশ। বার্ষিক তুলনায় সামান্য কমলেও মাসভিত্তিক হিসাবে মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্টভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান আক্রমণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে; যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচে। এই পরিস্থিতিতে এলপি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এ ছাড়া পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে ভোক্তাদের আগের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।
খাদ্যপণ্যে চাপ অব্যাহত: বিবিএস’র তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.৩৯ শতাংশ; যা মার্চে ছিল ৮.২৪ শতাংশ। বাজারে ভোজ্য তেল, শাকসবজি, ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি এবং ডিমের দাম বৃদ্ধির ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্যবহির্ভূত খাতে তীব্র উল্লম্ফন: অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত বেড়ে ৯.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে; যা মার্চে ছিল ৯.০৯ শতাংশ। এ খাতে জ্বালানি, পরিবহন, গ্যাস ও অন্যান্য সেবার মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। ফলে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
বিবিএস’র তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৫ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৩ শতাংশ ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৮১ শতাংশ। এপ্রিল মাসে শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৩৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০২ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৮১ শতাংশ ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৫ শতাংশ।
আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধি:
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির এই চাপ মূলত ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ অর্থাৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম বাড়ছে। কিন্তু আয়ের সেই অনুপাতে বৃদ্ধি না হওয়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল না হলে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার তদারকি জোরদার না করা হলে মূল্যস্ফীতি স্বল্পমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। তাদের মতে, জ্বালানি মূল্যের ধাক্কা সামাল দিতে বিকল্প নীতি; আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা; বাজার মনিটরিং জোরদার- এই তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
গত ১৯শে এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রতিলিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। আয় না বাড়লে তাদের সংসার চালানোর খরচ বেড়ে যায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর শাকসবজির দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে যায়। মাছ-মাংসের দামও বাড়ে।
গত ২০শে এপ্রিল জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছিলেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও ‘সেভাবে দাম বাড়বে না’। ‘মূল্যস্ফীতি কেন সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না- এটা একটু বোঝা দরকার’ বলে জাতীয় সংসদে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সারা পৃথিবীতে জ্বালানি তেলের মূল্য যে অনুপাতে যে রেশিওতে বৃদ্ধি পেয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে সেটি নিতান্তই মডেস্ট। অনেকগুলো দেশেই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াটি অটোমেটেড, মানে এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রিগার হয়, এটার জন্য সরকারের আলাদা কোনো পদক্ষেপ নিতে হয় না।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেশি বাড়ার কারণ হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর সকল পণ্যেরও দাম বাড়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
চাপে সাধারণ মানুষ: এদিকে গত এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি হার হয়েছে ৮.১৬ শতাংশ। এর মানে হলো, যত মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এর চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে পণ্য কিনতে ভোগান্তি বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয় কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হয়।
রাজধানীর মীরবাগ এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন কাজলী খাতুন। তিনি বলেন, ভাড়া বাসায় থাকি। সেখানে লাইনের গ্যাস নাই। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করি। গত কয়েক দিনে সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকা বাড়ছে। অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে। এত খরচ সামলাবো কেমনে।’
রাজধানীর মগবাজার এলাকার বাসিন্দা খলিলুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তার মাসিক বেতন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ঘরভাড়া, দুই সন্তানের লেখাপড়া, ওষুধ ও যাতায়াতের জন্য খরচ হয় ৩৮ থেকে ৩৯ হাজার টাকা। গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবাকে মাসে ১০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। বাকি ৯-১০ হাজার টাকা খরচ করেন দৈনন্দিন বাজারের জন্য। আগে এই টাকায় টেনেটুনে সংসার চলে যেত। কিন্তু এখন সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। কারণ, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় খরচ সামলাতে অনেক ব্যয় কমিয়েছে তার পরিবার। আগে ছুটির দিনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাঝেমধ্যে ঘুরতে বের হতেন হাবিবুর। এখন সেটাও বন্ধ। তারপরও ব্যয় সামলাতে পারছেন না।
ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, বাজারে একসঙ্গে অনেকগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তারা, বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষেরা খরচের চাপে পড়েছেন। পরিবহন খরচসহ সামগ্রিকভাবে পণ্যের দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে।