ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে টানা চার দিন পড়ে থাকলেও শেষ বিদায় জানাতে আসেননি খোকন মিয়ার (৫০) কোনো স্বজন। স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকার পরও কারও শেষ স্পর্শ জোটেনি তার কপালে। এমনকি শেষ পর্যন্ত আসার আশ্বাস দিয়েও আসেননি ছোট ছেলে রানা; বরং ফোনে জানিয়ে দেন যেন অপেক্ষা না করে মরদেহ দাফন করে দেওয়া হয়। অবশেষে মঙ্গলবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে 'বেওয়ারিশ' হিসেবে তাকে মেড্ডা সার গুদামের পেছনে দাফন করা হয়েছে।
৩৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত ৩০ এপ্রিল রাতে হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খোকন মিয়া। গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণ বা সেলুলাইটিস নিয়ে পুলিশ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি অস্পষ্ট কণ্ঠে নিজের নাম, বাবার নাম এবং কুমিল্লার একটি ঠিকানা বলেছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের মাধ্যমে তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে যোগাযোগ করা হলে স্ত্রী নিলুফা আক্তার ও দুই ছেলে খোকন মিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান এবং মৃত্যুর আগেই তারা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তার মরদেহ গ্রহণ করবেন না।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১০ থেকে ১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তার পরিবারের কোনো যোগাযোগ ছিল না। ১ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার উদ্যোগে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হলে পুলিশ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
দেবিদ্বার থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বললেন, পরিবারের সদস্যরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ থাকায় তারা মরদেহ গ্রহণে অপারগ।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ওসি শহীদুল ইসলাম জানান, পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলেও তারা কোনো আগ্রহ দেখাননি।
মানবিক দিক বিবেচনা করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর খোকন মিয়ার ছেলেকে বুঝিয়ে অন্তত একবার আসার অনুরোধ জানিয়েছিল। সংগঠনের পক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে শুরু করে দাফনের যাবতীয় খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হলেও কেউ সাড়া দেননি।
বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা মো. আজহার উদ্দিনের ভাষ্য, ‘মানবিক দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে যেন পরিবারের কেউ এসে তাকে শেষ বিদায় জানায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি, যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। স্ত্রী ও সন্তান থাকার পরও একবুক অবহেলা আর নিঃসঙ্গতা নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন খোকন মিয়া।’