Image description

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোজাফফর বিন মহসিন নামের এক ইসলামী বক্তার একটি বক্তব্য ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করে। ওই বক্তব্যে মোজাফফর বেনামাজিদের মুরতাদ আখ্যা দেন এবং তাদের হত্যা করার কথা বলেন। 

গত ১ মে মোজাফফর বিন মহসিনের ভেরিফায়েড পেইজে আপলোড করা ১২ মিনিটের এক ভিডিও বক্তব্যে বেনামাজিদের হত্যা করার ব্যাপারে মত দিয়ে তাকে বলতে শোনা যায়, “বেনামাজিকে মেরে ফেলে দিতে হবে, এ ব্যাপারে কোন ইমামদের মধ্যে এখতেলাফ নাই। কথাটা শুনে রাখেন ভালো করে, বেনামাজিকে মেরে ফেলতে হবে। হয় ফাঁসিতে ঝুলায়া, নাহলে তরবারি দিয়ে জবাই করে মেরে ফেলতে হবে। এ ব্যাপারে সাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ,  ইমামদের মধ্যে কোন এখতেলাফ নাই।”

বেনামাজিদের জানাজা পড়া যাবে না এবং এমনকি মা-বাবা হলেও  স্পর্শ করা যাবে না  দাবি করে তিনি বলেন, “এখতেলাফ কোন জায়গায় জানেন? ওকে হত্যা করার পরে ওর জানাজা পড়বো কি পড়বো না, এইটা নিয়ে এখতেলাফ। বেনামাজী মুরতাদ, ওকে হত্যা করতে হবে। এ ব্যাপারে কোন এখতেলাফ নাই। একদল আলেম ওলামা বলছেন যে জানাজা পড়া যায়, কারণ যেহেতু মেরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে, হদ জারি হয়ে গেছে অতএব আর সমস্যা নাই, জানাজা পড়া যেতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ আলেম ওলামা বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বলছেন আরে ওকে মুরতাদ হওয়ার কারণেই তো মারা হয়েছে ওর জানাজা কিসের? ওকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা হারাম। বেনামাজি মরে গেছে তো, মারা গেছে, মনে হয় আপনার বাপ, আপনার মা, বেনামাজি মারা গেছে, ওকে হাত দেওয়া, স্পর্শ করা যাবে না, হারাম ধরা যাবে না কিন্তু। ধরা যাবে না, খুব সাবধান।”

ভালোভাবে দাফন করা যাবে না দাবি করে তাকে বলতে শোনা যায়, “একটা মুশরেক যদি মারা যায় ওকে আপনি ধরতে পারবেন? একটা কাফের যদি মারা যায় ইহুদি বা খ্রিস্টান মারা যায় ওকে কি হাত দিয়ে ধরতে পারবেন? না হারাম। ওকে স্পর্শ করার সাথে সাথে আপনি অপবিত্র হয়ে যাবেন। ওকে স্পর্শ করা যাবে না। ধরাই যাবে না। গোসল তো অনেক পরের ব্যাপার রে ভাই।” এখন প্রশ্ন আপনাদের। কি করা যাবে তাহলে? কুকুর মারা গেলে কি করেন? কি করেন? পায়ে দড়ি বেঁধে ঘাড়ি করে ঘাড়ি করে নিয়ে যান? নিয়ে যান। কোথায় দাফন করেন? দূরে জঙ্গলে যেখানে আবাদ বিনেদ হয় না। আবাদ পানি হয় না। ওই জায়গায় দাফন করেন। এতো কুকুরের চেয়েও খারাপ। আল্লাহ বলেছেন বালহুম আদল। ও বেনামাজি কিন্তু আপনার চেয়ে ভালো জানে। ও বলছে কি জানেন? নামাজ না পড়লেও আমার ঈমান ঠিক আছে। এরে হারামখোর মাইরটা কেমন দেওয়ার দরকার বলেন দেখি! আস্তাগফিরুল্লাহ। ও ডবল কাফের ওর বুদ্ধি অনেক বেশি।”

মোজাফফরের বক্তব্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা যায় ব্যবহারকারীদের।

আসিফ আহমেদ নামের একজন ব্যবহারকারী ভিডিওটি শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, “এদের মতো কিছু উগ্রবাদী ও জঙ্গীরা আমাদের শান্তির ধর্মকে সারা বিশ্বে কলুষিত করছে।নিজেকে আল্লাহ'র আসনে বসিয়ে নিজেই পাপ-পূণের বিচার করতে চায় এরা।”

ফারজিনা মালেক নামের একজন লিখেছেন, “যারা নামাজ পড়েন না তাদের সরাসরি মেরে ফেলতে বলতেছেন এই হুজুর। মেরে তো ফেলবেনই, দিস ইজ ফর সিউর, তার আলাপ হচ্ছে, তার জানাজাও পড়া যাবে না। সিরিয়াসলি? দুনিয়ার ছয় বিলিয়ন লোকের মধ্যে তাইলে তো উনার এবং উনার অনুসারীদের পাঁচ বিলিয়ন লোককেই খুন করতে হবে।”

মো. মজিবুর রহমান লিখেছেন, “উনাকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না? দেশীয় আইনে কেন উনি গ্রেফতার হচ্ছেন না? জনগণ যদি একবার আইন নিজের হাতে তুলে নেন তখন কি সরকারের টনক নড়বে? বেনামাজি তো দূরের কথা কোন কাফেরকেও যুদ্ধ ছাড়া হত্যা করার বিধান ইসলামে নেই। এরাই আসল জঙ্গিবাদী।”

 

এই ফতোয়ার বিষয়ে কী বলছেন আলেমরা? 

বেনামাজিদের হত্যা করতে হবে এবং জানাজা পড়া যাবে না—মোজাফফর বিন মহসিনের এমন বক্তব্যকে আপত্তিজনক ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন দেশের শীর্ষ আলেমরা। এ ধরনের বক্তব্যের জন্য মোজাফফর বিন মহসিনকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত বলেও মত দিয়েছেন তারা। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকজন আলেমের সাথে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। তবে কয়েকজন আলেম নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এ ব্যাপারে বলেন, “ঢালাওভাবে এধরণের কথা বলা যাবেনা। ইমান ত্যাগ না করলে তো জানাজা পড়তে হবে। কেউ ইমান ত্যাগ করলো কিনা সেটার স্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। নামাজ না পড়লে কেউ বেইমান হয়ে যাবে, তাকে হত্যা করতে হবে এমন কথা তো কোথাও নেই। এমনিতে হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগ করলো সে কুফরি করলো। ইচ্ছাকৃত নামাজ না পড়লে সে কুফরি করলো কিন্তু এর মানে তো এই নয় যে সে বেইমান হয়ে গেছে। বেইমান হতে হলে তাকে ইসলামকে অস্বীকার করতে হবে। কেউ যদি বলে আমি ইসলাম মানি না, নামাজ মানি না, তাহলে সে বেইমান হবে।”

জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি রেজাউল করিম আবরার বলেন, “উনি যেটা বলেছেন সেটা শতভাগ ভুল কথা। ইসলামী শাসন থাকলে ভুল ফতোয়া দেয়ার অপরাধে তাকে দোররা মারা হইতো। কেউ যদি কাফের হয়ে যায় তাহলে তাকে আবার ইমান আনতে হয়। কিন্তু রাসুল তো বলে নাই নামাজ না পড়লে তাকে আবার ইমান আনতে হবে। নামাজ না পড়লে সেটা কাজা করতে বলা হয়েছে। এধরনের চিন্তা হলো খারেজি ও দায়েশী চিন্তা। উম্মাহর’র মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য এ ধরণের কথা বলা হয়। ওই বক্তা বলেছেন অধিকাংশ আলেম নাকি হত্যা ও জানাজা না পড়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে। কোন আলেম, চার মাজহাবের কোন ইমাম এমন কথা বলেছেন। কোন ইমাম এ ধরণের কথা বলেননি। হাদিসে নামাজ না পড়ার ব্যাপারে ধমকের সুরে কথা বলা আছে, কিন্তু এ ধরণের কোন কথা নেই।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের অধ্যাপক ইসলামী ব্যক্তিত্ব ড. আব্দুল্লাহ আল-মারুফ বলেন, “বেনামাজী কাফেরও নয়, মুরতাদও নয়। বেনামাজী গোনাহগার। গোনাহগার হওয়া মানে এই নয় যে সে কাফের হয়ে গেছে। বরং যারা এসব কথা বলে তাদের বন্দী করা উচিত। সরকারের উচিত এদের মুখে তালা দেয়ার ব্যবস্থা করা। এরা যে ফতোয়া দেয় এদের কোন সার্টিফিকেট আছে ফতোয়া দেয়ার? এরা ইহুদিদের টাকা খেয়ে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করার জন্য এসব কথা বলে। এরা আমাদের সমস্ত মেধা, শ্রম ধ্বংস করার জন্য এসব বলে। আর জানাজার ব্যাপারে যেটা বলা হয়েছে- গোনাহগারের জানাজা না পড়লে কার জানাজা পড়বে? জানাজা তো মৃত ব্যক্তির গোনাহ মাফ চাওয়ার জন্যই পড়া হয়।”

 

আগেও আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন মোজাফফর

২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট ইসলামী ফ্রন্টের নেতা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে তার বাসায় ঢুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এক দল ব্যক্তি। সে সময় ফারুকী হত্যায় উস্কানির দায়ে মোজাফফর বিন মহসিনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছিল পুলিশ। 

ইউটিউবে পাওয়া এক পুরনো ভিডিওতে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে দাজ্জাল আখ্যা দিতে শোনা যায় মোজাফফর বিন মহসিনকে। 

দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর সিআইডির দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে মতাদর্শীক দ্বন্দ্বের কারণে মাওলানা ফারুকীকে হত্যা করে জঙ্গি গোষ্ঠী জেএমবি। 

চার্জশিটে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, “নিহত নুরুল ইসলাম ফারুকী একজন সুফি মতবাদের অনুসারী এবং ইসলামি বক্তা ছিলেন। তিনি একজন মাজারের অনুসারী লোক ছিলেন। অপরদিকে আসামিরা জেএমবি মতাদর্শের লোক ছিল।”

এই বক্তাকে প্রায়ই উত্তেজক বক্তব্য প্রদান, বিভিন্ন জনকে কাফের ও বেদায়াতি আখ্যা দিতে দেখা যায়। বিভিন্ন বক্তব্যে তাবলীগ জামায়াতের অনুসারীদের মূর্খ ও জাহেল বলে আখ্যা দিতে শোনা যায় মোজাফফর বিন মহসিনকে। এছাড়া বাংলাদেশের  সব মাজার ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায় তাকে বিভিন্ন বক্তব্যে। 

এক বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, “যত মাজার আছে সবগুলো সরকারি নির্দেশে গুড়িয়ে ভেঙে দেওয়া উচিত। এখানে র‌্যাব লাগবেনা, সেনাবাহিনী লাগবে না, সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হয়েছে। যত বাংলাদেশে মাজার আছে সবগুলো জুয়ার আড্ডাখানা, সবগুলো গাঁজার আড্ডাখানা, সবগুলা যৌনাচারের আড্ডাখানা, বেহায়পনা, অশ্লীলতার শেষ নাই। শুধু ইশারা দিয়ে দিবে, যত মাজার আছে, তরুণরা ইয়াংরা যত আছে সব ভেঙে চুরমার করে দিবে।”

বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও মোজাফফর বিন মহসিনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।