ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘রক্তে লাল সাদা জোব্বা’ শিরোনামে এক ব্যতিক্রমধর্মী চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহ, সহিংসতার প্রেক্ষাপট, হতাহত ও পরবর্তী পরিস্থিতির নানা দিক দলিলচিত্র, আলোকচিত্র, সংবাদপত্রের কাটিং প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৫ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সামনে বেলা ১১ টা থেকে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ প্রদর্শনীটি বেলা ১১ টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে।
প্রদর্শনীর সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। তিনি বলেন, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত এ ঘটনা নতুন প্রজন্মের সামনে তথ্যনির্ভর উপায়ে তুলে ধরার লক্ষ্য থেকেই এ আয়োজন করা হয়েছে।
ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ‘আমরা বিগত সময়ে দেখেছি, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও বিভিন্ন দাবির কথা বলতে এসে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহিংসতার মুখোমুখি হন। কেউ হয়তো তাদের সব দাবির সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু তাই বলে মানুষ হত্যাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। হেফাজতের দাবি অনুযায়ী সেদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছিল।
তবে মিডিয়া ব্ল্যাকআউট ও তথ্য গোপনের কারণে আজও প্রকৃত সত্য পুরোপুরি সামনে আসেনি; কতজন মানুষ নিহত হয়েছেন, কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল, সেসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো অজানা। এ ঘটনাকে ঘিরে বিচার তো হয়নি-ই, বরং বছরের পর বছর ভিকটিম ব্লেমিং করা হয়েছে। মানুষ হত্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে গাছ কাটা, দোকান লুট বা আগুন দেওয়ার অভিযোগ; যেগুলোর অনেকগুলোরই সত্যতা আজও নিশ্চিত হয়নি। এরপরও সব দায় চাপানো হয়েছে নিহত ও আহত মানুষগুলোর ওপর।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছি, সেদিন কী ঘটেছিল, কতটা নির্মম ছিল সেই অভিযান, এবং পরবর্তী সময়ে মিডিয়া কীভাবে ঘটনাটিকে ফ্রেম করেছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা হয়নি, নতুন প্রজন্মকেও জানতে দেওয়া হয়নি। আমি নিজেও যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন এ ঘটনা সম্পর্কে খুব কমই জানতাম। আমাদের সামনে শুধু ‘তাণ্ডব’ এর বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছিল, কিন্তু মানুষ হত্যার বিষয়টি আড়ালেই থেকে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ মনে করে, ৫ মে’র ঘটনাকে স্মরণ রাখা এবং এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেতনার অংশ হিসেবেই আমরা মনে করি, ইতিহাসের এ অধ্যায় নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে তারা জানতে পারে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।’
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এই সমাবেশটি সংগঠনটির ঘোষিত ১৩ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে আহ্বান করা হয়। শাহবাগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কিছু ব্লগার ইসলাম, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করে লেখালেখি ও অ্যাক্টিভিজম করার প্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলাম কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের দাবি ছিল, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। এ প্রেক্ষাপটে সংগঠনটি ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা, ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন এবং ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানায়। উপরোক্ত দাবিসমূহের ভিত্তিতে ঢাকায় একটি বড় আকারের সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয় যাতে সারাদেশ থেকে আসা কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়।