মাত্র ২৬ বছর বয়েসের মেয়েটিই এখন সংসদ সদস্য। বলছিলাম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বাগোয়ান গ্রামের তরুণী নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতির কথা। যিনি ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনের মাঠ পেরিয়ে উঠে এসেছেন জাতীয় সংসদের আসনে। রাজনীতিতে তার এই উত্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের (২০১৮–১৯ সেশন) শিক্ষার্থী নুসরাতের শৈশব কেটেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মধুরাপুর ইউনিয়নের বাগোয়ান গ্রামে। শিক্ষক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তরুণী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বিতর্ক, আবৃত্তি, হস্তশিল্প ও নাট্যচর্চায় সক্রিয়।
তিনি বাগোয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং বাগোয়ান কেসিভিএন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার জন্য তিনি ড. ফজলুল হক গার্লস ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন।
২০১৮ সালে ঢাকায় এসে কোচিং করার সময় দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাকে নাড়া দেয়। একই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ২০১৮-এর মাধ্যমে তার আন্দোলন জীবনের সূচনা। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে ছিলেন সরব।
২০২১ সালে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক হন নুসরাত। এরপর ২০২৩ সালে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি’-তে যোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ৬ জুন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি সরাসরি জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ফ্রন্টলাইনারে পরিণত হন।
জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোতে নারীদের সংগঠিত করা, হামলার সময় মানবঢাল হয়ে দাঁড়ানো এবং নির্যাতনের শিকার হয়েও পিছু না হটার কারণে আলোচনায় আসেন তিনি। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ওই দিন রাতেই শামসুন্নাহার হলসহ বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসলে তাদেরকে নিয়ে মিছিল করেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্যের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠনের পর তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করলে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কদের দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৬ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এনসিপি তাদের নারী শাখা জাতীয় নারী শক্তি চালু করে। এই সংগঠনের প্রধান সংগঠক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পান। যেখানে মনিরা শারমিনকে আহ্বায়ক এবং মাহমুদা আলম মিতুকে সদস্য সচিব করা হয়।
এদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১৩তম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের আগে নুসরাতকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, যার সদস্য ছিল এনসিপি। এরপর ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে তিনি বিকাল ৪টা ১৯ মিনিটে মনোনয়নপত্র জমা দেন, যা নির্ধারিত সময়সীমার (বিকাল ৪টা) ১৯ মিনিট পরে ছিল। এ কারণে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন প্রথমে তার মনোনয়ন বাতিল করে।
তবে ২৭ এপ্রিল তিনি হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদন করেন, যাতে তার প্রার্থিতা পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তার আবেদন শুনে নির্বাচন কমিশনকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
তারপর ২ মে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয় এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন খান নুসরাতের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে প্রার্থিতা ফিরে পেতে মনিরা শারমিন আদালতে রিট করে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেন যে, আদালতের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেন নুসরাতের গেজেট প্রকাশ করা না হয়। তবে সোমবার (৪ মে) মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা ওই রিট আবেদনটি শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। বেঞ্চের এক বিচারপতি এবং রিট আবেদনকারী একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় রিটটি শুনানির জন্য অন্য বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (৫ মে) নুসরাত তাবাসসুমকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।