Image description

ক্রমাগত বর্ষণে গত কয়েকদিনের তলিয়ে গেছে কৃষকের পাকা বোরো ধান। এ ধান পানির নিচ থেকে কেটে তুলতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন কৃষক। তবু রক্ষা হচ্ছে না ধান। রোদ না থাকায় ভেজা ধানে গজাচ্ছে চারা। এতে কৃষকের দুঃখ-দুর্দশার যেন শেষ নেই। ধান নিয়ে কান্না যেন থামছে না কৃষকের।

সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে হানা দিয়েছে আগাম বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়া। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চলনবিলের সিংড়ার শত শত কৃষকের ‘সোনার ফসল’ এখন হুমকির সম্মুখীন। সরেজমিন দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ ফসল বাঁচাতে নিরুপায় কৃষকেরা এখন প্রকৃতির সঙ্গে এক অসম ও মরণপণ যুদ্ধে নেমেছেন। এ বছর সিংড়া উপজেলায় প্রায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে।

সিংড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। একদিকে নদীর পানি বিলে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে সেই পানি ঠেকাতে স্থানীয় জনতা ও কৃষকেরা একতাবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি ধান কাটতে কাজ করছেন নারীরাও। সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় বসে না থেকে গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে বালুর বস্তা সংগ্রহ করে ফসল বাঁচানোর এক রকম যুদ্ধে নেমেছেন স্থানীয়রা।

হাঁসপুকুরিয়া গ্রামের শাকিল হোসেন বলেন, আমরা গ্রামবাসী ও কৃষকেরা একত্রিত হয়ে গত কয়েকদিন ধরে এ ভাঙা স্লুইস গেটের মুখে বালুর বস্তা ফেলছি। কিন্তু নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে এ অস্থায়ী বাঁধ কতক্ষণ টিকবে তা নিয়ে আমরা সবাই চিন্তিত। মাঠের পর মাঠ ধান পেকে থাকলেও তা ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। তিনি নিজেই বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এ বিষয়ে নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম আনু বলেন, আগাম বন্যার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছি। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি। আমি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করছি এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছি।

মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের মধুপুরে গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে উপজেলায় কৃষকদের আবাদ করা প্রায় পাঁচশ বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপজেলার ধানের খনি খ্যাত অরণখোলা, কুড়াগাছা ইউনিয়নের ১১ গ্রামের বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে হাওদা বিলের অবস্থান। এ বিলের প্রায় পাঁচশ বিঘা জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণে ওইসব এলাকার কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ নেমে এসেছে। যদি অতিদ্রুত এ পানি নিষ্কাশন না হয় তাহলে ক্ষতির মধ্যে পড়েবে কৃষকেরা। এমন পরিস্থতিতে ধার-দেনা করে চাষ করা কৃষক ও বর্গাচাষিরা রয়েছেন আরো কঠিন বিপাকে। সময়মতো যদি পানি না নেমে যায় তাহলে কোনো কোনো কৃষকের পথে বসার উপক্রম হবে।

মধুপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে এক হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও অনেক ভালো হয়েছে। এর মধ্যে মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী হাওদা বিলে বিস্তৃতি কাকরাইদ, সাইনামারি, ভুটিয়া, গাছাবাড়ী, জলছত্র, পিরোজপুর, পলাইটেকি, মালিবাজার, কামারচালা, বলাইদপাড়া এলাকার প্রায় শতাধিক হেক্টরজুড়ে ধান আবাদ হয়েছে। এ বিলে সারা বছরে একবার ধান আবাদ হয়ে থাকে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই তারা ধান কেটে ঘরে তুলে থাকেন। কিন্তু এ বছর সেই ধান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকের স্বপ্ন মাটি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কৃষক শাহীন মিয়া বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ পাকি জমির সব ধান ডুইবা গেছে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলবার পারমুনা। আমার মতো শত শত কৃষকের একই অবস্থা।’ আকবর হোসেন জানান, মৌসুমের শেষের দিকে হঠাৎ আবহাওয়া বৈরী হওয়ায় আমাদের সব ধান এখন পানির নিচে। যদি অতি দ্রুত পানি নেমে যায় তাহলে হয়ত কিছু ধান কাটা সম্ভব হবে।

এ ব্যাপারে মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে মধুপুর উপজেলায় এক হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকের পরিচর্যার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। তবে হঠাৎ ভারী বর্ষণে মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চলের ধানি জমি পানিতে ডুবে গেছে।