Image description
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানালেন ডিসিরা

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। তাদের যুক্তি-মূল্যবৃদ্ধি ও বিভিন্ন খরচে জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় রেশন সুবিধা, বিনামূল্যে সরকারিভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তুলে ধরে তা সমাধানেরও প্রস্তাব করেছেন। ভোজ্যতেলের সংকট কাটাতে রাইস ব্রান তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের লাইসেন্সের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, সড়কের ভাঙাচোরা মেরামতসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব করেছেন তারা। রোববার শুরু হওয়া চার দিনের ডিসি সম্মেলনে তারা এসব প্রস্তাব দিয়েছেন।

সম্মেলনে রেশন দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন পিরোজপুরের ডিসি। এ কর্মকর্তার যুক্তি-মূল্যবৃদ্ধি ও বিভিন্ন খরচে জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এতে ধারদেনা ও ঋণে মানসিক চাপ বাড়ছে। ফলে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটছে। রেশন চালু হলে চাপ কমবে, জীবনযাত্রা সহজ হবে বলে তিনি মত দেন। বলেন, এতে মনোযোগ বাড়বে সরকারি দায়িত্বে। তিনি ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে চাকুরেদের জন্য এ প্রস্তাব দিয়েছেন। কারণ, এসব গ্রেডেই সবচেয়ে বেশি কর্মচারী। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব পাবলিক সার্ভেন্ট-২০২৪’ অনুযায়ী সাড়ে ১৪ লাখ কর্মচারীর মধ্যে এই আট গ্রেডেই আছে ১০ লাখ ৩৫ হাজার।

রোববার পূর্বনির্ধারিত সময় ও কর্মসূচি অনুসারে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার এবং ডিসিরা উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে মোট তিনজন বিভাগীয় কমিশনার এবং নয়জন ডিসি বক্তৃতা করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি কর্মচারীদের ২০টি বেতন গ্রেড রয়েছে। এক নম্বর গ্রেডে সচিব, দুই নম্বরে অতিরিক্ত সচিব, তিনে যুগ্ম এবং চার নম্বর গ্রেডে উপসচিব। তারাই ডিসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। রেশন সুবিধার প্রস্তাব এসেছে বান্দরবান ও রাঙামাটির ডিসিদের কাছ থেকেও। তাদের মত, রেশন সুবিধা দিলে কাজের আগ্রহ ও সেবার মান বাড়বে।

উল্লেখ্য, রেশনের দাবি জানাতে গিয়ে জেল খেটেছেন সচিবালয়ের কর্মচারীদের নেতা বাদিউল কবীরসহ ১৪ জন কর্মচারী এবং এ সংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান। তাছাড়া ১০ বছর তাদের বেতন বাড়েনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কমিশন গঠন করে বেতন কাঠামোর সুপারিশ তৈরি এবং তা পাশও করে গেছেন। কিন্তু নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জিনিসপত্রের দাম অত্যধিক বাড়ায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ডিসি সম্মেলনের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

চর এলাকার জীবনযাপন কতটা কঠিন, তা উঠে আসে কুড়িগ্রামের ডিসির প্রস্তাবে। তার মতে, চর এলাকায় জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঝুঁকিতে সেখানে অবস্থান করতে নিরুৎসাহিত হন সরকারি কর্মচারীরা। কুড়িগ্রামের ডিসি এজন্য চর-ভাতা চালুর কথা বলেন। ডিসিরা ভাতা পেলে সেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি জানান।

কর্মচারীদের জন্য ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রস্তাব করেছেন কুমিল্লার ডিসি। তার যুক্তি, মেডিকেল ভাতা হিসাবে তারা যা পান, তা অপ্রতুল। তিনি সরকারি দপ্তরের অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কথাও বলেন। এছাড়া দপ্তরের অনিয়মিত গাড়িচালকদের কম বেতনের কথাও উঠে আসে সম্মেলনের বক্তব্যে। বলা হয়, ভূমি অফিসের অনিয়মিত গাড়িচালকরা মাসে পান ১৫ হাজার ৪০০ টাকা। অতিরিক্ত বেতন না থাকায় ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনে অনীহা থাকে তাদের। চরে কর্মরত শিক্ষক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও অন্য চাকুরেদের সমস্যা তুলে ধরেছেন কেউ কেউ।

নিত্যপণ্যের বাজারের উত্তাপের কথাও ডিসি সম্মেলনে উঠছে নানা দিক থেকে। ডিসিদের প্রস্তাবগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খাতে ফুটে উঠেছে স্বাস্থ্যের দুরবস্থা। তেমনই রয়েছে শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, খাদ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক প্রস্তাব। সেসব প্রস্তাবে শুধু যে সরকারি চাকুরেদের বিষয়ই এসেছে, তা নয়। সাধারণের বিষয় বিবেচনা করেই বেশির ভাগ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

কর্মচারীদের সময়মতো এবং মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন রাজবাড়ীর ডিসি। দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের বদলে তিনি স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাব করেন। এছাড়া ঝুঁকিভিত্তিক বিমা মডেল গ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন তিনি।

চিকিৎসাসেবায় অগ্রাধিকার রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের। রাজধানীসহ নানা জায়গায় তাদের জন্য আছে নির্ধারিত হাসপাতাল; যা সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসাবে বিবেচিত। তারপরও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি হাসপাতালে মেডিকেল টেস্ট ফি নির্ধারিত থাকলেও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তা থাকে না। এ খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব করেছেন মাগুরার ডিসি।

ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি রোধ তথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাইস ব্রান অয়েল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করেন বগুড়ার ডিসি। তার মতে, এতে সরবরাহ বাড়বে। নিয়ন্ত্রণে থাকবে অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির প্রবণতা।

মাগুরার ডিসি বলেন, যখনই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখনই সচল হয় টিসিবি। সেই সংস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রস্তাব করেন তিনি। এই ডিসির মতে, টিসিবি বাজারে থাকলে প্রতিযোগিতা বাড়ে, নিয়ন্ত্রণে থাকে মূল্যবৃদ্ধি।

৪৯৮টি প্রস্তাবের মধ্যে একটিতে জীবনযাপন কষ্টসাধ্যের কথা বলেছেন গোপালগঞ্জের ডিসি। তিনি মডেল মসজিদের মুয়াজ্জিন, ইমামসহ ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্তাব্যক্তিদের চাকরি স্থায়ী করা এবং বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। এ ডিসি বলেন, কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ, ফসলের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ন্যয্যমূল্যপ্রাপ্তি কৃষকের অধিকার। টাঙ্গাইলের ডিসি কৃষকের সুরক্ষায় আরও নজর দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

পিরোজপুরের ডিসি প্রস্তাব করেছেন, উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি করতে হবে ইউএনওকে। কারণ, যাবতীয় দায়িত্ব এবং জবাবদিহি তাকেই করতে হয়। মানবিক সহায়তা বাস্তবায়ন ও সহায়তা ইউএনওকেই করতে হয়। কমিটির সভাপতি তাকে করা হলে ত্রাণ কার্যক্রম আরও সহজ হবে বলে তিনি মত দেন। বলেন, দুর্যোগে প্রস্তুতি ও মোকাবিলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও এনজিওকে করতে হয়। সেই ক্ষেত্রে ইউএনওকে সভাপতি করা হলে সেবার মান বাড়বে। গোপালগঞ্জের ডিসি প্রস্তাব করেন, ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের লাইসেন্সের জন্য নীতিমালা প্রয়োজন। কারণ, এ যানবাহন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। লাইসেন্সবিহীন হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই কার্যকর আইন প্রয়োগে এ যানবাহন আইনের আওতায় আনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

এছাড়া একাধিক ডিসি বেহাল সড়ক-মহাসড়কের কথা উল্লেখ করে তা মেরামতের প্রস্তাব করেন। তারা বলেন, সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং এতে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। জরুরি ভিত্তিতে সড়ক মেরামত করা না হলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে বলে তারা মত দেন। এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে কথা তুলে ধরেন কয়েকজন ডিসি। শিক্ষকস্বল্পতার কথা বলেছেন কেউ কেউ। কেউ কেউ আইসিটি ও হিন্দু ধর্মের শিক্ষক নিয়োগের কথাও বলেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করেন বেশ কয়েকজন ডিসি।

অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে কথা বলেন গোপালগঞ্জের ডিসি। তিনি বলেছেন, অর্পিত সম্পত্তি দ্বিতীয় সংশোধনীর পর এ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক সময় জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল থেকে রায় নিয়ে অনেকে মালিক বনে যাচ্ছেন।