Image description

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে রাতের অন্ধকারে চালানো নির্মম ও নিষ্ঠুর গণহত্যা মামলার তদন্ত ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০১৩ সালের ৫ মে’র মহাসমাবেশে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি’র তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রাতের অভিযান ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’য় কতজন নিরীহ মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রকে হত্যা করা হয় তার কোনও সঠিক পরিসংখ্যান ১৩ বছরেও পাওয়া যায়নি। আহতদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত এ হত্যাকা-ের ঘটনায় নেপথ্যে জড়িত ও মদদদাতাদের অনেকে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদন্তের নামে সময় নেয়ার প্রেক্ষিতে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা ৬৮টি মামলার এখন আর তদন্তই হচ্ছে না। এসব মামলার তদন্ত নিয়ে পুলিশেরও এখন আগ্রহ নেই। তবে ঘটনার সময় ঢাকাতেই ৩২ জনের প্রাণহানির তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। অন্যদিকে শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

 সংগঠনটির আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজেদুর রহমান এ দাবি জানান। ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম রোববার জানান,শাপলা চত্বর হত্যাকা-ের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব শীঘ্রই ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে। চীফ প্রসিকিউটর জানান, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকা-ের মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ওই ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ওই মহাসমাবেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করতে পৃথক তদন্ত চলছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্তের পুরো চিত্র পাওয়া যেতে পারে। আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তিনি বেসামরিক ব্যক্তি, পুলিশ, র‌্যাব বা সেনাবাহিনীর সদস্য যেই হোন না কেন, সবাইকেই বিচারের আওতায় আনা হবে। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও হত্যাকা-ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া সে সময়কার সরকারের ঊর্ধ্বতনদের বা পুলিশের যারা জড়িত রয়েছেন কিংবা অর্থের জোগান দিয়েছেন; তাদেরও আসামি করা হবে।

এদিকে, গত ৫ এপ্রিল শাপলা চত্বর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিলের তারিখ ধার্য ছিল। তবে প্রসিকিউশন সময় চেয়ে আবেদন করলে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আগামী ৭ জুন পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। শাপলা চত্বরে হত্যাকা-ের মামলায় এখন পর্যন্ত ৬ জন গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল ম-ল। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধী যে পর্যায়েরই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। এমনকি ওই সময় শাহবাগ কেন্দ্রিক ‘গণজাগরণ মঞ্চ’র ভূমিকা নিয়েও তদন্তকারী সংস্থা তথ্য পেয়েছে।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, সেই রাতের ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর অভিযানে ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’। তবে পুলিশের দাবি, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি, বরং দিনভর সংঘাতে নিহত হয়েছেন ১১ জন। অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির তৎকালীন এক ডজনেরও বেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। গণহত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মতিঝিল এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গভীর অন্ধকারে সমাবেশের তিন দিক ঘিরে ফেলে রাষ্ট্রীয় তিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথ অভিযান চালায়। পুলিশের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’, র‌্যাবের ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট শাপলা’ এবং বিজিবির ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ নাম দিয়ে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়ে সাত হাজার সশস্ত্র সদস্য অংশ নেয় এবং দেড় লক্ষাধিক গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়। সূত্র মতে, শাপলা চত্বর গণহত্যায় নিহতের সঠিক সংখ্যা এখনও অজানা। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শহীদের সংখ্যা ৩০০-এর বেশি। পুলিশের গোপন রিপোর্টে ১৯১ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ ২০১৩ সালের ১০ জুন প্রথম অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট প্রকাশ করে। প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ৬১ জনের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা হয়। আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ লাশ দাফনের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মে মাসে অস্বাভাবিকভাবে ৩৬৭টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়, যা প্রতি মাসের গড় দাফনের চেয়ে চারগুণ বেশি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শাপলা চত্বর গণহত্যার পর ৬ মে ফজরের আজানের সময় লাশগুলো গুম করা হয়। র‌্যাব কর্মকর্তা লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ঘটনাস্থল থেকে লাশ সরানোর নেতৃত্ব দেন। তিনি অ্যাম্বুলেন্স ও সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে লাশ গুম করেন। গণহত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়। ঢাকায় এমন ৫৩টি এবং সারা দেশে ৮০টির বেশি মামলায় হেফাজতের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। মাদরাসাগুলোতে হানা দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়, কিছু প্রকাশ করা হলে রেহাই মিলবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আলেম-ওলামা ও ছাত্রদের সম্পূর্ণ চুপ থাকতে হুকুম দেয়। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতটি ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে সংঘটিত এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের রাত।