নড়াইলের বুকচিড়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্তা চিত্রা নদী এখন মৃতপ্রায়। প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলদারদের থাবায় সংকুচিত হয়ে এখন খালে পরিণত হতে চলেছে। শুধু তাই নয় জেলা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এ নদীর পানিও এখন শিল্প ও নর্দমার বর্জ্যে দূষিত।
সরেজমিনে দেখা যায়, নড়াইল শহরের পুরাতন টার্মিনাল, মাছিমদিয়া এবং রূপগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীর দুই পার দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে নদী ভরাট করে দোকানপাট, ঘরবাড়ি এমনকি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিন যেতে না যেতেই আবারও সেখানে ফিরে আসে দখলদাররা। জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, মানচিত্র অনুযায়ী নদীর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত না হওয়ায় দখলের প্রক্রিয়া থামানো যাচ্ছে না।
প্রবীণরা জানান, চিত্রা শুধু একটি নদী নয়, এটি নড়াইলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। একসময় চিত্রা নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এমনকি দেখা যেত বিলুপ্তপ্রায় শুশুক। কিন্তু ব্যাপক দূষণের ফলে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। অনেক প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদীর পানিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন পারের বাসিন্দারা।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক ডাক্তার জানান, চিত্রা নদীর বর্তমান প্রধান সমস্যা তীব্র দূষণ। শহরের অধিকাংশ ড্রেনের সংযোগ সরাসরি নদীতে দেওয়া হয়েছে। রূপগঞ্জ বাজারের কসাইখানা ও মাছ বাজারের যাবতীয় বর্জ্য প্রতিদিন মিশছে এই পানিতে। এ ছাড়াও পলিথিন, ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্য এবং ক্লিনিক্যাল বর্জ্য প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে দূষিত পানির দুর্গন্ধে নদীর পার দিয়ে চলাচল করা অনেক মানুষের জন্য দুঃসহ হয়ে পড়েছে।
নড়াইলের পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা জানান, চিত্রা নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়, নদীর তলদেশ খনন (ড্রেজিং) এবং নদীর স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ জরুরি। সেই সঙ্গে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে যাতে কোনো বর্জ্য বা দূষিত পানি সরাসরি নদীতে না পড়ে।
?স্থানীয় জনসাধারণের দাবি অবিলম্বে ‘দখল ও দূষণমুক্ত’ করে চিত্রা নদীকে তার পুরোনো যৌবন ফিরিয়ে দেওয়া হোক। অবৈধভাবে দখলদারদের উচ্ছেদ ও দূষণমুক্ত করার ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে এই ঐতিহ্যবাহী নদীটি। নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা বিগত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চিত্রা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু এ ব্যাপারে তারা মুখে বললেও বাস্তবে তা আলোর মুখ দেখে না। এ ব্যাপারে নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসনে আরি তান্নি বলেন, চিত্রা নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য আমরা দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নদী দূষণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ব্যাপারেও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।