Image description

সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের চোখ রাঙানিতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকার অব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প ব্যবস্থা না করে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে বের হয়ে আসার সিদ্ধান্ত ডেকে এনেছে বিপদ। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এর মধ্যেই ২৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অবহেলার ফলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে যক্ষ্মা, এইচআইভির (এইডসের ভাইরাস) মতো ২৬টি রোগ।

ওপি বন্ধ হওয়ায় হাম ও রুবেলা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, হেপাটাইটিস, রক্তস্বল্পতা, গর্ভকালীন জটিলতা, কালাজ্বর, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, নারী ও প্রসূতি রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কৃমি, রাতকানা, টাইফয়েড, পোলিও, এইচআইভি, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, চর্মরোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, অন্ধত্বসহ ২৬টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে বাড়ছে রোগের বিস্তার, ভুক্তভোগী হচ্ছে মানুষ।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিগত দুই সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়হীতা, দুর্নীতির কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। নির্দিষ্ট সময় পর পর শিশুদের সুরক্ষায় হামের টিকার ক্যাম্পেইন করতে হয়। কিন্তু টিকাদানে বিঘ্ন ঘটায় হামের পরিস্থিতি খারাপ হয়েছিল। আমরা দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে ক্যাম্পেইন শুরু করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে কাজ শুরু করেছি। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে ৬ লাখ কিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডেঙ্গুজ্বর যেন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেজন্য দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্ষার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। এজন্য উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে সাপের কামড়ে মৃত্যু প্রতিরোধে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম সরবরাহ করা হচ্ছে। সারা দেশের হাসপাতালে শয্যা ও আইসিইউ-এর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

 স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জোরদার করতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সেবা ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে চালু হচ্ছে হেলথ কার্ড। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র আড়াই মাসে সরকার এই উদ্যোগগুলো নিয়েছে। ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের পুনর্গঠনে আগামী বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ কয়েক গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ওপি বন্ধ হওয়ায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনে নিত ইপিআই। এ পদ্ধতিতে টিকা কেনায় সময় ও জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম লাগত। কিন্তু হঠাৎ ওপির মাধ্যমে টিকা কেনার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে টিকা কেনা হবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয় নানা প্রশ্ন তোলে। পরে মন্ত্রণালয় আবার টিকা কেনায় ইউনিসেফকে যুক্ত করে। এই টানাপড়েনে চলে যায় কয়েক মাস। ফলে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। এতে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকার পূর্ণ বা আংশিক ডোজ পায়নি। টিকা না পাওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে শিশুরা।

ইপিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুদের বিভিন্ন বয়সে সাতটি টিকা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ১১ ধরনের রোগপ্রতিরোধ করা হয়। যক্ষ্মার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দেওয়া হচ্ছে বিসিজি (বিসিজি) টিকা। এ ছাড়া রয়েছে পেন্টাভ্যালেন্ট বা পেন্টা টিকা, যা একাই পাঁচটি রোগপ্রতিরোধে সক্ষম। এটি শিশুদের ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস (হুপিং কাশি), ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি এবং হেপাটাইটিস-বি থেকে সুরক্ষা দেয়। পোলিও নির্মূলে দুই ধরনের টিকা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মুখে খাওয়ার জন্য ওপিভি এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে আইপিভি। এ ছাড়া শিশুদের নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে দেওয়া হয় পিসিভি টিকা। হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে এমআর টিকা। টাইফয়েড প্রতিরোধে শিশুদের দেওয়া হয় টিসিভি টিকা। আর রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়া প্রতিরোধে ওনার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এই সবগুলো টিকা প্রদানের কার্যক্রম গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ ও সমন্বয়হীনতার কারণে ২৬টি রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে ওপির অনেক সাফল্য রয়েছে। ওপি বন্ধ করে দেওয়া একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। ওপি বন্ধ করে দেওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে টিকা কর্মসূচিতে। এখন হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নজরে এসেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছিল। চতুর্থ কর্মবার্ষিক পরিকল্পনায় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে মানুষ ও কুকুরের টিকার পেছনেই ব্যয় করা হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব বিনিয়োগ বিফলে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কঠিন হয়ে পড়বে।’ 

জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানোর ক্যাম্পেইন হয়েছে। তারপর থেকে এই ক্যাম্পেইন বন্ধ রয়েছে। ফলে শিশুদের রাতকানা রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রতিবছর জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহে প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হতো। এই কর্মসূচিও বন্ধ রয়েছে এক বছর ধরে। এতে কৃমি সংক্রমণ ফেরার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি সয়েল ট্রান্সমিটেড হেলমিনথোসিসও নির্মূলের পথে ছিল। এই কর্মসূচিও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অর্থসংকটে ২০২৪ সাল থেকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কার্যত সীমিত রয়েছে। অথচ দেশে এখনো ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়াপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বিশেষ করে মশারি বিতরণ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও স্থানীয় চিকিৎসা বন্ধ করার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণ ফের বাড়তে শুরু করবে। এই কর্মসূচির অধীনে বছরে তিনটি ডেঙ্গু জরিপ করা হতো, সেটিও গত বছর থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু বাড়তে শুরু করেছে।

১৮ বছর আগে কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচি নেওয়া হয়। উপজেলা পর্যায়ে এটি প্রায় নির্মূল অবস্থায় আনা হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটি ফের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে শুরু হয় বিনামূল্যে এইচআইভি শনাক্তকরণ কর্মসূচি। ওপি শেষ হওয়ার পর থেকেই কিট সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। চলতি বছরে এক লাখ ১০ হাজার ডিটারমাইন কিট কেনা হলেও ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিট যথেষ্ট পরিমাণে সংগ্রহ করা হয়নি। এতে কিট সংকট দেখা দিয়েছে।