চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে- এমন হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিল সরকার। সরকারের নির্দেশনা পেয়ে দেশব্যাপী একটি তালিকা তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখন সেই তালিকা ধরেই চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। গত দু’দিনে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগর পুলিশ ১৫২ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করেছে। এরমধ্যে ৫৮ জন তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরে আরও ৯৪ জন।
ডিএমপি’র তরফে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, কোনো চাঁদাবাজ-অপরাধীকে ছাড় দেয়া হবে না। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। ওদিকে গতকাল কুমিল্লা সদর উপজেলা বিএনপি নেতা রেজাউল কাইয়ুমকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন তার সমর্থকরা।
এরই মধ্যে ৬৫১ জন পেশাদার শীর্ষ চাঁদাবাজের তালিকা নিয়ে কাজ শুরু করেছে এলিটফোর্স র্যাব। এই তালিকার মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৩২৪ জন চাঁদাবাজের নাম রয়েছে। তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীই বেশি।
গত ৪ঠা মার্চ ডিএমপি সদর দপ্তর পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, চাঁদাবাজ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শিগগিরই রাজধানী থেকে দেশব্যাপী অভিযান শুরু হবে। তালিকা তৈরিতে পুলিশকে ‘নির্মোহ’ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করেই গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হবে। শুরুতেই গ্রেপ্তার করা হবে তাদের, যাদের নাম অন্তত দুইটি সংস্থার তালিকায় রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সূত্র বলছে, রাজধানীর ৫০ থানায় অন্তত ৩২৪ জন চাঁদাবাজ সক্রিয়। এর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে সর্বোচ্চ ১২৭ জন, মিরপুরে ৪২, গুলশানে ৩৯, উত্তরায় ৪১, ওয়ারীতে ২১, মতিঝিলে ১১, লালবাগে ২৪ এবং রমনা বিভাগে ১৯ জন রয়েছে। থানাভিত্তিক হিসেবে তেজগাঁও এলাকায় সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজ সক্রিয়। কাওরান বাজার, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্পটে প্রায় ৪০ জন চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকায় ৩১ জন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ৩০ জন এবং মিরপুরের দারুসসালাম এলাকায় ২৬ জন চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, বাসস্ট্যান্ড, মহাসড়ক ও লঞ্চঘাটে টোলের নামে, হাওর এলাকায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে নানা কায়দায় চাঁদাবাজি করে আসছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, চাঁদাবাজদের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতিমধ্যে সকল ইউনিট প্রধানদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা এসপি হয়ে এখন থানার ওসি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আগে থেকে করা তালিকা ধরে পাকড়াও করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২রা মে সারা দেশে ২০৬টি মাদক মামলায় ২৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশ থেকে ৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) মো. রেজাউল করিম মানবজমিনকে বলেন, পুরো দেশে চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এসব অপরাধে যারাই জড়িত তাদেরকে ধরার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দেশ থেকে অপরাধ কমানোর জন্য পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, চাঁদাবাজদের নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পরপরই তারা আদালতে গিয়ে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। কারামুক্ত হওয়ার পরপরই তারা আবার চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সারা বছরই র্যাবের অভিযান চলে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে র্যাব। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে র্যাব সবসময়ই জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে। তাই চাঁদাবাজ যেই হোক না কেন তাদের কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেয়া হবে না। আইনের আওতায় আনা হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেছেন, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও মাদকের নেপথ্যে মূলহোতা, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং অনলাইন জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হয়েছে। গত ১লা মে থেকে এ চার শ্রেণির অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার নাগরিকদের নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অঙ্গীকার।
এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং অপরাধ দমনের অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ চাঁদাবাজি, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও অনলাইন জুয়াড়িসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিমিত্ত একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই, অপরাধ চক্রের মূল উৎপাটন করে নাগরিক জীবনের স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং ঢাকা মহানগরকে আরও নিরাপদ নগরীতে পরিণত করা।
তিনি বলেন, চিহ্নিত অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ অভিযান এবং আকস্মিক ব্লক রেড পরিচালনা, ক্ষেত্রবিশেষে চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দার নজরদারি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অপরাধীদের পালানোর পথ বন্ধ করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন আসামিদের তাৎক্ষণিক যাচাই বাছাই করে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটগণের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিচারে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যারা বড় অপরাধী তাদের নরমাল প্রসিডিউর অনুযায়ী মামলা করে আদালতে প্রেরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও, ডিবি, সিসিটিসি’র সাদা পোশাকের সদস্য, সাইবার মনিটরিং টিম এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। অনলাইন জুয়া প্রতারণা এবং সংগৃহীত অপরাধে প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।
কমিশনার বলেন, বিভিন্ন কাঁচাবাজার, বড় মার্কেট, টার্মিনাল কেন্দ্রিক ব্যবসা এবং চিহ্নিত এলাকায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ ঝটিকা অপারেশন পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন মামলায় বা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, চাঁদাবাজদের বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। যেগুলোর ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে মামলার আলামত হিসেবে কোর্টে প্রডিউস করা হবে। তিনি বলেন, মাদক কারবারিদের পেছনে যারা গডফাদার আছে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করে সিআইডিসহ আমাদের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংসহ অন্যান্য মামলা দায়ের করার প্রসিডিউর চলছে।
একইসঙ্গে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সসহ আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী এবং ডিজিটাল প্রতারণায় জড়িত চক্রের সদস্যদের আটক করা হচ্ছে। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল, সার্ভার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এর বাইরে এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদার ও নাগরিকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বসিলা এবং কাওরান বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দুটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি, আরও কয়েকটি জায়গায় শিগগিরই পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। রায়ের বাজার পুলিশ ফাঁড়িকে থানায় রূপান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, ঢাকার নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে আগামীদিনের কর্মপরিকল্পনায় ডিএমপি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অপরাধপ্রবণ নতুন নতুন এলাকা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে আরও পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে এবং মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, বাজার, সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, যাতে দ্রুত অপরাধী শনাক্ত ও অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব হয়।
এ ছাড়াও আগামীদিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজধানীব্যাপী আরও জোরালো, তথ্যভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। চাঁদাবাজি প্রতিরোধে হটস্পটভিত্তিক নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক নির্মূলে নিয়মিত ব্লক রেইড ও বিশেষ চেকপোস্ট, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা তৎপরতা সম্প্রসারণ, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংসে সমন্বিত অপারেশন, সাইবার প্রতারণা ও অনলাইন জুয়া দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং ও জনসম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী করা হবে।