Image description

রাজধানীর নিউমার্কেটে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই শুটারসহ কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের অনুসারী কিনা, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে নিউমার্কেট থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটি কার্যত অগ্রগতিহীন অবস্থায় রয়েছে। ঢাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ফের অস্থিরতার কথা বলছেন কেউ কেউ।

ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা বলছে, তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথি বিশ্লেষণ করে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করতে আরও সময় লাগবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন টিটন মোবাইল ফোন সঙ্গে না নেওয়ায় তার অবস্থান ও কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল— তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডিবির একটি সূত্র জানায়, পূর্বপরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ডে টিটনকে নিউমার্কেট এলাকায় ডেকে আনা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, তার ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তি তাকে সেখানে যেতে প্ররোচিত করে, যাতে হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জ এলাকার বাসায় ফেরার পথে নিউমার্কেট এলাকা দিয়ে যাতায়াত নিশ্চিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ তৈরি করতেই এই স্থান বেছে নেওয়া হয় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

 

পুলিশের ধারণা, মাত্র ৪ মিনিটের মধ্যে সংঘটিত এই ‘কিলিং মিশন’-এ পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় এবং এরপরই হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পুরো ঘটনায় ঢাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তদন্তে পাওয়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পুরো সময়রেখা উদ্ধার করেছে তদন্তকারীরা। এতে দেখা যায়, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীর নিউমার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকায় ঘুরছিল দুই মোটরসাইকেল আরোহী শুটার।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সন্ধ্যা ৬টার দিক থেকেই ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান নেয় তারা। পরে রাত ৭টা ৫০ মিনিটে নীলক্ষেত মোড়ে তাদের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করা হয়। একই সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনও।

 

‘হত্যার পর অডিও ছড়িয়ে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন পিচ্চি হেলাল। হেলালের বক্তব্য সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করতেই এ অপপ্রচার। পরিবারের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। হেলালের ব্যবহৃত সব মোবাইল জব্দ করে ফরেনসিকে দিলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’— টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন

এরপর টিটন হেঁটে ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হলে, মোটরসাইকেলে থাকা দুই শুটার তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে, রাত ৭টা ৫৪ মিনিটে তারা টিটনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় একে একে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় তাকে লক্ষ্য করে।

হামলার পরপরই শুটাররা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তারা বিজিবি গেটের সামনে দিয়ে ইরানি মাঠের পাশ হয়ে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে উঠে যায়। সেখান থেকে দ্রুত গতিতে কেরানীগঞ্জের আটিবাজারের দিকে পালিয়ে যায় বলে সিসি ফুটেজে দেখা গেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, পুরো ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং হামলাকারীরা নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করে খুব দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সানজিদুল ইসলাম ইমন ও ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, ছবি: সংগৃহীত

সন্দেহে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম

টিটন হত্যার পেছনের কারণ নিয়ে তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, ঢাকার অপরাধজগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী—‘সিটি অব গড’ খ্যাত ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং সানজিদুল ইসলাম ইমন।

জানা যায়, নিহত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনসহ সন্দেহভাজন এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুর এলাকায় একসঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন। পরবর্তীতে অপরাধজগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, নিহত নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে সন্দেহের তালিকায় থাকা দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। বিশেষ করে সানজিদুল ইসলামের সঙ্গে তার অস্ত্র ব্যবসা ও ঢাকার অপরাধজগতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টানাপোড়েন চলছিল বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েও টিটনের সঙ্গে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের বিরোধ তৈরি হয়। এ ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর যে কোনো একটি পক্ষই পূর্বশত্রুতার জেরে টিটনকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

এদিকে নিহত টিটনের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি। এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলালসহ তার তিন সহযোগী— বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান এবং রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদীর দাবি, বছিলার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েই মূলত টিটনের সঙ্গে তাদের বিরোধ চলছিল

মোবাইলের অ্যাপসে যোগাযোগ করতো টিটন

টিটন হত্যা মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন জানিয়েছেন, ঘটনার এক সপ্তাহ আগেও ছোট ভাই খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে তার যোগাযোগ হয়েছিল।

তিনি বলেন, টিটন দীর্ঘদিন কারাবাসে ছিলেন। একই সময়ে তিনি নিজে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছিলেন। ২০১৮ সালে দেশে ফেরেন তিনি। তখনো টিটন কারাগারে ছিলেন।

রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকের কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান টিটন। মুক্তির পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং স্বাভাবিক মোবাইল ফোনে যোগাযোগ না করে অ্যাপসের মাধ্যমেই সীমিত যোগাযোগ রাখতেন। ঘটনার আগে নিয়মিত ফোনে নয়, অ্যাপসে কথা হতো।

‘টিটন হত্যায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গত এক মাসের মধ্যে টিটনের সঙ্গে কথা বলতে একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি। টিটনের পরিবারের মধ্যেই বিরোধ ছিল। বোন ও বোন জামাইয়ের (ইমন) সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। টিটন ও তার বড় ভাইয়ের ফোন ফরেনসিক করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।’— ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল

হুমকিতে থাকার কথা আগেই জানিয়েছিলেন টিটন

রিপন বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত টিটন গত রমজানের ঈদে যশোর কোতোয়ালি এলাকার নিজ বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেটিই ছিল তার শেষ বাড়ি ফেরা। এরপর থেকে আর বাড়িতে যাননি।

রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন থেকেই টিটন বিভিন্ন ঝামেলা ও হুমকির মধ্যে ছিল বলে জানিয়েছেন। এমনকি গত সপ্তাহেও চলমান ঝামেলায় থাকার কথা জানিয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, গত ২৭ এপ্রিল টিটন ফোন করে প্রতিপক্ষ তাকে আলোচনার জন্য ডেকেছে এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছিল। ওই সময় টিটন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, গরুর হাটের ইজারার কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই হুমকি-ধমকির মধ্যে ছিলেন। তবে পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানান।শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যার ঘটনাস্থল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা, ছবি: সংগৃহীত

রিপনের মতে, টিটন বলেছিলেন—‘ঝামেলা মিটে গেছে, আমরা একসঙ্গেই কাজ করবো, ওরা বসতে চায়, মীমাংসা হয়ে যাচ্ছে।’

পরদিন ২৮ এপ্রিল রাতে জানতে পারি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রাতেই ঢাকা আসি। ২৯ এপ্রিল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে ছোট ভাইয়ের মরদেহ শনাক্তের পর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন সম্পন্ন করি।

ভগ্নিপতি ইমনই খুন করেছে টিটনকে, দাবি পিচ্চি হেলালের

গণমাধ্যমে দেওয়া এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল টিটন হত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এ বিষয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, গত এক মাসের মধ্যে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে কথা বলতে একটি শব্দও উচ্চারণ হয়নি।

পিচ্চি হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহলে টিটনের শত্রুকে? টিটনই বলে গেছে যে ইমন ওকে মারতে চায়। পারিবারিকভাবে ওর সমস্যা আছে। টিটনের নিজের পরিবারের মধ্যেই বিরোধ ছিল। তার বোন ও বোন জামাইয়ের (ইমন) সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। তারা দুজনই চেয়েছিল টিটন মারা যাক। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।

পিচ্চি হেলাল তার বক্তব্যে আরও বলেন, এখন প্রযুক্তির যুগে সব কিছুই যাচাই করা সম্ভব। তার দাবি অনুযায়ী, এজাহারে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে— হাটের ইজারা বা পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে টিটনের দ্বন্দ্ব ছিল— তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। টিটন ও তার ভাই রিপনের ফোন ফরেনসিক করলে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের কথোপকথন হয়নি।

হাটের ইজারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিটন আদৌ কোনো সিডিউল নিয়েছিল কিনা তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের রেকর্ড যাচাই করলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। আমার জানামতে ওর তো এসব ঝামেলায় আসার কথা না।

যমুনা টিভিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে পিচ্চি হেলাল বলেন, তখন টিটন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং সেই সময় আমরা একসঙ্গে ছিলাম।

পিচ্চি হেলাল দাবি করেন, ঢাকা শহরে এখন একদম দোর্দন্ডপ্রতাপের সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে ইমন। মিরপুরে ফোরস্টার গ্রুপ আর এদিক থেকে একদম পুরান ঢাকা পর্যন্ত যদি ধরেন আপনি তাহলে ইমন রিলেটেড। কী পরিমাণ চাঁদা ইমন তোলে তা জানলে চক্ষু চড়ক গাছে উঠে যাবে। সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ইন্টারনেট, ডিশ ব্যবসা, ময়লার ব্যবসাসহ সব একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ চায় বা নিচ্ছে ইমন। সে সবকিছু করছে সব জায়গায়, কিন্তু এখন টোটালি সিন আউট। ও সিনের মধ্যেই নাই।

ভগ্নিপতি ইমন হত্যা করেছে, মানে না টিটনের পরিবার

আরেক সূত্রের দাবি, জেল থেকে বের হওয়ার পর টিটন শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সঙ্গে যোগ দেয়। এ নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল হক ইমনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। সাজেদুল হক ইমনের ছোট বউ নীলার বড় ভাই টিটন। তবে মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নাম দেননি নিহত টিটনের ভাই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টিটনের বড় ভাই মামলার বাদী রিপন বলেন, আমাদের সঙ্গে ইমনের ভালো সম্পর্ক, যোগাযোগ আছে। ইমন টিটনকে হত্যা করবে এটা আমরা পারিবারিকভাবেই বিশ্বাস করি না। মামলায় অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের কাজ তদন্ত করে পরিকল্পনাকারীসহ হত্যাকারীদের খুঁজে গ্রেফতার করে শাস্তি নিশ্চিত করা।

শুটার কারা?

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, টিটনকে গুলি করেছেন একজন এবং আরেকজন সহযোগী ছিলেন। তারা একটি মোটরসাইকেল করে ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। দুজনের মুখেই মাস্ক ছিল। যিনি গুলি করেছেন তার মাথায় ক্যাপ ছিল এবং পরনে সাদা শার্ট ছিল। গুলি করার পর তারা মোটরসাইকেলে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। টিটনের কপাল, মাথা, ঘাড়সহ শরীরে ছয়টি গুলি করা হয়।

‘টিটন হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সামনে কোরবানি, আধিপত্য ও গরুর হাট নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। এ হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত সেটি উদঘাটন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’— ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম

পরিবারের দাবি, টিটন হত্যার ঘটনা ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে পিচ্চি হেলাল

টিটনের বড় ভাই রিপনের দাবি, হত্যার পর একটি অডিও ছড়িয়ে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন পিচ্চি হেলাল। শনিবার (২ মে) দুপুরে সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিপন বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রাতে আমার ছোট ভাই টিটনকে হত্যার পর পিচ্চি হেলাল একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে দিয়ে নানা ধরনের মিথ্যাচার করছে। সে আমাদের পারিবারিক কলহের যে দাবি করেছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। মূলত তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতেই সে এই অপকৌশল নিয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। ইমন একজন উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পিচ্চি হেলাল নিজের অপরাধ ঢাকতে এসব আবোল-তাবোল বলছে।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উল্লেখ করে রিপন বলেন, পিচ্চি হেলাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এছাড়া, জেলখানায় থাকাকালীনও টিটনের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল।

অডিও রেকর্ডে ফোন ফরেনসিক করার চ্যালেঞ্জের জবাবে নিহতের বড় ভাই বলেন, আমি আমার ফোন ফরেনসিকে দিতে প্রস্তুত। তবে দাবি জানাচ্ছি, পিচ্চি হেলালের ব্যবহৃত সবকটি মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিকে পাঠানো হোক। তাহলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

টিটন হত্যা মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. নাসিম এ গুলশান বলেন, ‘এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ধরে শুটারকে শনাক্তের কাজ চলছে।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সামনে কোরবানি, আধিপত্য ও গরুর হাট নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। এ হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত সেটি উদঘাটন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে, গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতপাড়ায় ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন ও গত বছরের ২৫ মে বাড্ডা গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন হত্যার সঙ্গে অনেকটাই মেলে টিটন হত্যার কিলিং মিশন।

মামুন হত্যার নেপথ্যে নাম আসে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের। আর সাধন হত্যায় নাম আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী হাসানের। মামুন ও সাধন হত্যার কিলিং মিশনেও রাখা হয়েছিল ব্যাকআপ টিম। টিটন হত্যার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল অথবা টিটনের ভগ্নিপতি ইমনের হাত রয়েছে বলে ধারণা করছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।