Image description
সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠক

উচ্চ আদালতের (সুপ্রিম কোর্টের) বিচারপতিদের বয়সসীমা কমানো নিয়ে আলোচনা উঠেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠকে। গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিচারপতিদের বয়স ৬৭ বছর থেকে কমিয়ে ৬৫ বছর করার কথা বলা হয় একজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে। তবে বিষয়টি নিয়ে এ কমিটির বৈঠকে আলোচনা না করে, এটি সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে আলোচনায় ওঠানোর প্রস্তাব দেয় সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য।

জানা যায়, ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। তখন বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধির পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠে।

গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠকের অনির্ধারিত আলোচনায় বিরোধীদলীয় একজন সংসদ সদস্য বলেন, বিচারপতি নিয়োগের বয়স ৬৭ বছর করার ক্ষেত্রে বিএনপির একটি কলঙ্ক রয়েছে। ওই বয়স কমিয়ে ৬৫ বছর করে সরকার সেই কলঙ্ক মোচন করতে চায় কি না? পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে ওঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন), বিল ২০২৬-এর ওপর কমিটির সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিলগুলো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট আকারে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি। পরে এদিন রাতেই রিপোর্ট দুটি সংসদে উত্থাপন করেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।

সভাপতি ছাড়াও কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক এমপি, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান এমপি, মো. রফিকুল ইসলাম খানি এমপি এবং জি এম নজরুল ইসলাম এমপি। এ ছাড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন কালবেলাকে বলেন, ‘বিচারপতিদের বয়স কমানোর বিষয়টি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উত্থাপনের চেষ্টা করেছে। আমরা বলেছি, ঠিক আছে। বয়স কমাতে চাইলে আপনারা সংবিধান সংশোধনে বিষয়টি বিল আকারে আনেন।‘

বিচারপতিদের বয়স কমানোর আলোচনার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে মুজিবুর রহমান এমপি কালবেলাকে বলেন, আমাদের মূল কথা হচ্ছে, বয়স বাড়ানো-কমানো বড় কথা নয়। কথা হলো যে, নিজেদের দলীয় লোককে ঢোকানোর জন্য অনেক সময় এটা করা হয়। প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর কারণে সেই নির্বাচনের সময় জাস্টিস কে এম হাসানকে নিয়ে তো ঝগড়া হয়েছে। আমাদের বক্তব্য সুস্পষ্ট, দলীয় লোক নিয়োগ করা যাবে না, একা একা নিয়োগ করা যাবে না। পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলে তাহলে এই সমস্যার সমাধান হবে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিষয়টি আলোচনায় ওঠানোর ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কাল (আজকে) সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। এটুকুই শুনে রাখেন। সব কথা এখানে বলা তো ঠিক না।’

জানা গেছে, ২০০৪ সালের আগে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ছিল ৬৫ বছর। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে, ২০০৪ সালের ১৬ মে চতুর্দশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। সংশোধনীটি নিয়ে তখন বিতর্ক ওঠে। তৎকালীন বিরোধী দল এবং আইন বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছিলেন, এটি করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অবসরের সময় পিছিয়ে দেওয়ার জন্য, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা সরকারি দল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।

সে সময় আলোচনা উঠে যে, মূলত তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসনকে টার্গেট করে এটা করা হয়েছিল। যাতে অবসরের পরে বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন। পরবর্তী সময়ে বিরোধীদের আপত্তির মুখে বিচারপতি কে এম হাসান দায়িত্ব না নেওয়ার কথা জানালে বিকল্প অনুসন্ধান না করেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কর্মকাণ্ডে বিএনপির প্রতি তার দলীয় আনুগত্যের প্রকাশ স্পষ্ট হতে থাকে। এক পর্যায়ে ২০০৭ সালে আন্দোলনের মুখে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।