Image description
দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন, বলছে দুদক

অবৈধ আয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, জায়গা-জমি, স্ত্রী-শ্বশুর-শাশুড়ি-ভাইবোনসহ দুঃসম্পর্কের আত্মীয়স্বজনদের নামেও গড়েছেন বিপুল সম্পদ। স্বজনদের নামে প্লট-ফ্ল্যাট কিনে সম্পদের উৎস আড়াল, ব্যাংক হিসাব ও এফডিআরের জটিল জালে অর্থ ঘুরিয়ে মানি লন্ডারিং, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ার কেনার নামে ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার সন্ধান মিলেছে এক সরকারি কর্মকর্তার। কর কর্মকর্তার চেয়ারে বসে সেবাপ্রত্যাশীদের ফাইল আটকে এ বিপুল সম্পদ গড়েছেন এ সরকারি কর্মকর্তা। এর ফলে রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি এ কর্মকর্তা হলেন একসময়ের যুগ্ম কর কমিশনার ও বর্তমানে বগুড়ার অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল।

জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে এ কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য মিলেছে। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে দুদকের উপপরিচালক শেখ গোলাম মাওলা বাদী হয়ে একটি মামলাও করেছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একসময়ের যুগ্ম কর কমিশনার ও বর্তমানে বগুড়ার অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব), পরিদর্শী রেঞ্জ-১ ও ২ কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল নিজ নামে ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৪ জনের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১৭ কোটি ২১ লাখ ৯৪ হাজার ৩১৮ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন ও দখলে রেখে এর অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন এবং মানি লন্ডারিংয়ের উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খুলে সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। ১০ জন আসামি এসব অপরাধলব্ধ সম্পদ নিজেদের নামে গ্রহণ, দখলে নিয়ে কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালকে মানি লন্ডারিংয়ে সহায়তা করেছেন। তিন আসামি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হিসাব খুলে সন্দেহজনক লেনদেন করে কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালকে মানি লন্ডারিংয়ে সহায়তা করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

মামলায় আসামিরা হচ্ছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল, তার স্ত্রী আফসানা জেসমিন, শ্যালক আফতাব আলী, শাশুড়ি মমতাজ বেগম, শ্বশুর আহম্মেদ আলী, ভাই কাজী খালিদ হাসান, মামা শ্বশুর শেখ নাসির উদ্দিন, খালা শাশুড়ি মাহমুদা হাসান, শ্যালিকা ফারহানা আফরোজ, খালা রওশন আরা খাতুন, খন্দকার হাফিজুর রহমান, বোন ফারহানা আক্তার, মা কারিমা খাতুন এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজী নূর-ই-আলম ছিদ্দিকী।

যত সম্পদ: কাজী আৰু মাহমুদ ফয়সালের নিজ নামে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন দমন কামতা মৌজায় রূপগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-৩৭৫২; জমির পরিমাণ ৬ কাঠার ১/৭ অংশ। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন গুতিয়াব (১) মৌজায় রূপগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-১১৬৫৭; জমির পরিমাণ ০.০৩ একর। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন হারারবাড়ি মৌজায় রূপগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-৬৬৯৫, জমির পরিমাণ ৩৩৪.৪৫ বর্গমিটার। ঢাকা জেলার খিলগাঁও থানাধীন নন্দিপাড়া মৌজায় দলিল নং-৮৯৭১, জমির পরিমাণ ০.২৭ একর এর ১/৬০ অংশ। ঢাকা জেলার ভাটারা থানাধীন বড় কাঁঠালদিয়া মৌজায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট (প্রা.) লিমিটেডের প্লট নং-৫৯৯, সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-৯২৩১ এবং দলিল নং-১০৮৭৫; জমির পরিমাণ ০৫ কাঠা। এ জমিটি নিজের ও স্ত্রীর নামে কেনা হয়েছে।

 

এ ছাড়া কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল তার স্ত্রী আফসানা জেসমিনের নামে ঢাকা জেলার ভাটারা থানাধীন বড় কাঁঠালদিয়া মৌজায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট (প্রা.) লিমিটেডের প্লট নং-১৮৯৬, ব্লক-এম, সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-১০৫০০, জমির পরিমাণ ০৫ কাঠা। এ জমির দলিল মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ১৮ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে এ জমি ৭৫ লাখ টাকায় কেনা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন কামতা মৌজায় পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্প, সেক্টর নং-২১, প্লট নং-০১৮, রূপগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-৯৮২১, জমির পরিমাণ ২০০.১৭ বর্গমিটার। কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের শ্বশুর আহমেদ আলীর নামে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের রূপায়ণ আবাসন প্রকল্পের আওতায় ‘রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয়’, ৫৬-৫৭, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকায় ২৯৯০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট এবং ২৩৮ বর্গফুট কার পার্কিংসহ মোট ৩,২২৮ বর্গফুট ১১তম তলায় আই-১০ নং ফ্ল্যাট সাবরেজিস্ট্রি অফিস তেজগাঁও, ঢাকা এর দলিল নং-৪০৬২। কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের শাশুড়ি মমতাজ বেগমের নামে আফতাবনগর হাউজিং প্রকল্পের এন/এস বোড, ব্লক নং-এইচ, প্লট-এইচ-৪-এ জমির পরিমাণ ১০ কাঠার একটি প্লট। খিলগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-১৮০৫। প্লটটির ক্রয় মূল্য ৫২ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত মূল্য সাড়ে ৪ কোটি টাকা, যা নিশ্চিত করেছেন বিক্রেতা। এভাবে এ কর্মকর্তা নিজ নামে চারটি প্লট, নিজের স্ত্রী আফসানা জেসমিনের নামে দুটি প্লট ও তাদের যৌথ নামে একটি প্লট, শাশুড়ি মমতাজ বেগমের নামে একটি প্লট ও শ্বশুর আহম্মেদ আলীর নামে একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। দুদকের অনুসন্ধানে যেসব সম্পদের মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকার প্রমাণ মিলেছে।

ব্যাংকে যত সঞ্চয়পত্র: এ ছাড়া কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের নিজ নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বিজয়নগর শাখা ও প্রধান শাখায় যথাক্রমে ৩০ লাখ ও ২০ লাখ টাকা—মোট ৫০ লাখ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। তার স্ত্রী আফসানা জেসমিনের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংক, বিজয়নগর শাখায় ৫ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় ২১ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় ১০ লাখ টাকা, ওয়ান ব্যাংকের মগবাজার শাখায় ১৪ লাখ টাকাসহ মোট ৫০ লাখ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। শ্যালক আফতাব আলীর নামে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় ২৯ লাখ টাকা, প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় ১ লাখ টাকাসহ মোট ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। ভাই কাজী খালিদ হাসানের নামে সোনালী ব্যাংক, খুলনা করপোরেট শাখায় ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। শ্বশুর আহম্মেদ আলীর নামে ঢাকা ব্যাংকের কেডিএ শাখায় ২০ লাখ টাকা, একই শাখায় আরও ১০ লাখ টাকা, একই শাখায় আরও ১০ লাখ টাকা ও ২০ লাখসহ মোট ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। খালা শাশুড়ি মাহমুদা হাসানের নামে অগ্রণী ব্যাংকের এইচএমএম রোড শাখা, যশোরে ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং খন্দকার হাফিজুর রহমানের নামে অগ্রণী ব্যাংকের স্যার ইকবাল রোড শাখা, খুলনায় ৩০ লাখ টাকা ও একই শাখায় আরও ১০ লাখ টাকাসহ মোট ৪০ লাখ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। আবু মাহমুদ ফয়সাল ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে মোট ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের প্রমাণ মিলেছে।

এ ছাড়া আবু মাহমুদ ফয়সাল তার স্ত্রী আফসানা জেসমিনের নামে ৮৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯১৯ টাকা মূল্যের শেয়ার ক্রয়, শ্যালক আফতাব আলীর নামে ৪০ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫০ টাকা মূল্যের শেয়ার এবং শ্বশুর আহম্মেদ আলীর নামে ৪৪ লাখ ১৩ হাজার ১৪৩ টাকা মূল্যের শেয়ার ক্রয়সহ মোট ১ কোটি ৭০ লাখ ৪৬ হাজার ৭১২ টাকা মূল্যের শেয়ার ক্রয় করেছেন বলে তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। আবু মাহমুদ ফয়সাল নিজের নামে ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নামে অস্থাবর সম্পদ হিসাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন হিসাবে গচ্ছিত রেখেছেন ৬ কোটি ৯৬ লাখ ৫০ হাজার ৯০৮ টাকা। তিনি নিজ নামে ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে মোট অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে আবু মাহমুদ ফয়সাল ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নামে ৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর ও ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ মোট ১৮ কোটি ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮০ টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জনের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে—অভিযুক্ত কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল তার অবৈধ আয়ের উৎস, প্রকৃতি, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন করতে একটি সুপরিকল্পিত আর্থিক জাল গড়ে তোলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজের নিকটাত্মীয় ও স্বার্থসংশ্লিষ্টদের—স্ত্রী আফসানা জেসমিন, মা কারিমা খাতুন, বোন ফারহানা আক্তার, ভাই কাজী খালিদ হাসান, শ্বশুর আহম্মেদ আলী, শাশুড়ি মমতাজ বেগম, শ্যালক আফতাব আলী, খালা রওশন আরা খাতুন, খালা শাশুড়ি মাহমুদা হাসান, শ্যালিকা ফারহানা আফরোজ ও মামা শ্বশুর শেখ নাসির উদ্দিনসহ অন্যদের নামে সঞ্চয়পত্র ক্রয় ও বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধ আয়ের ছদ্মাবরণ দেওয়ার চেষ্টা করেন।