Image description

রাজস্ব আয় আশানুরূপ না হওয়ায় সরকারকে ঋণ করে চলতে হচ্ছে। অবশ্য নতুন সরকারের কাছে এর বিকল্পও নেই। আর তাই দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সরকারকে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। এমনিক টাকা ছাপিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছে। এছাড়া গত মঙ্গলবার নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারই কঠোর শর্তযুক্ত ‘নন-কনসেশনাল’ ঋণ। এর বড় অংশই বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে, ঝুঁকি কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে। এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধে সরকার এখনো চাপে আছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ দেশের আগামী দিনে মূল্যস্ফিতী, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এমনিতেই দেশে নতুন বিনিয়োগে বড় বাধা চড়া সুদে ব্যাংক ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট। এমনিতেই ব্যাংক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্থবির করেছে। সরকারের ঋণ করার সমালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে খারাপ অবস্থা চলছে, এ জন্য ঋণ করার বিকল্প নেই। সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিলে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি করলে উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে। মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, এখন ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করে কর আদায় বাড়ানোর দিকে নজর উচিত। আবার কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাড়তি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সূত্র মতে, বাজেট-ঘাটতি পূরণ করতে চলতি অর্থবছরের ১২ মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা ছিল, অর্থ মন্ত্রণালয় ৯ মাসেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যা মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে সরকার ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ঋণের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যয় সংকোচন ও রাজস্ব বাড়ানোয় গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। এদিকে মাসিক ঋণ নেওয়ার সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সুদ, ভর্তুকি পরিশোধসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে টাকা ছাপিয়ে বাড়তি ঋণ নিতে হয়েছে। অবশ্য তা ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ধারদেনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে, যা পুরো বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

বাজেটের লক্ষ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মার্চ শেষে দেখা গেল, খরচের চাপ সামাল দিতে না পেরে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) সরকার ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ ছিল ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। কিছু ঋণ পরিশোধের পর তা এখন প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। মার্চ মাসের শেষের দিকে সরকারের বাড়তি টাকার দরকার হয়। সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হয়। কিন্তু তত দিনে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফট-২টি হিসাবে ১২ হাজার কোটি করে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের সীমাও পেরিয়ে যায়।

কিন্তু সরকারকে ধার দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘টাকা ছাপানো’র প্রক্রিয়ায় যেতে হয়। টাকা ছাপিয়ে বাড়তি টাকার জোগান দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই অর্থ রিজার্ভ মানি বা হাই পাওয়ারড মানি হিসেবে পরিচিত। এক টাকা ছাপালে বাজারে কয়েকগুণ অর্থ সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। অবশ্য অর্থ মন্ত্রণালয় দুই সপ্তাহের মধ্যে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেয়। এর ফলে বাজারে এর প্রভাব তেমন একটা পড়েনি।

এদিকে সরকার বেশি ঋণ নিলে নানা ধরনের চাপ সৃস্টি হতে পারে। যদি টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে বেশি দামে জিনিসপত্র কিনতে হয়, যা মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণের সুযোগ কমে আসে। এতে নতুন নতুন কলকারখানা নির্মাণ হয় না। নতুন ব্যবসা হয় না কিংবা সম্প্রসারণ হয় না। এতে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যায়।

অন্যদিকে সরকারের দিক থেকেও চাপ বাড়ে। বাড়তি ঋণের ফলে সরকারের দায়দেনা বাড়তে থাকে। এ জন্য ঋণের আসল ও কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ে। সুদ বাবদ খরচ বাড়তে থাকে। গত কয়েক বছর ধরে বাজেটের অন্যতম বড় খরচের খাত হলো দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ। এতে সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো গুরত্বপূর্ণ খাতে খরচ বাড়াতে হিমশিম খেতে হয়।

সূত্র মতে, এ বছর সরকার প্রায় আট লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার জোগান দেওয়ার কথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। এ ছাড়া রাজস্ব ও রাজস্ববহির্ভূত খাত থেকে টাকা জোগাড় করে সরকার। বাকি বাজেট-ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক খাত, সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়। এবার ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার কারণে সরকারের রাজস্ব আদায় সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়। তাই রাজস্ব আয় বাড়বে, সে আশা করা কঠিন।
সংশোধিত বাজেট অনুসারে, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী তিন মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক-কর আদায় করতে হবে।

এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে আদায় করতে হবে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা আদায় না করলে লক্ষ্য অর্জিত হবে না। অবশ্য চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নিয়েছে। কিন্তু এপ্রিল মাসে এসে সেই ঋণ কমিয়েছে নতুন সরকার। এতে ঋণের চাপ কিছুটা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ৯ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ কমে হয় ২৩ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ বেড়ে হয় ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। ২১ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কমে হয় ৩ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। পুরো ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণ কমে হয় ৯৭ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। পরদিন ২২ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ আরও কমে হয় ২১২ কোটি টাকা। আর পুরো ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণ কমে হয় ৯৩ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকব্যবস্থা তথা সার্বিক ঋণ কমাতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এগুলো হলো- রাজস্ব বাড়ানো। করজাল বিস্তৃত করা, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় ছাঁটাই এবং অপচয় কমানো। সাশ্রয়ী বিকল্প উৎস খোঁজা। যেমন-ব্যাংকঋণের বদলে সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও বৈদেশিক স্বল্পসুদি ঋণের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতে চাপ কমবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে জো দেওয়া। এছাড়া ঘাটতির সীমা নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা।