বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাড়ছে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর হার। বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায় ১২ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ। তাপ বাড়লে বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। যা শক্তিশালী বজ্রমেঘ সৃষ্টির মুখ্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। ঋতুচক্রের পরিবর্তন বজ্রপাতের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর্দ্র ও তপ্ত বাতাসের সংমিশ্রণে বায়ুম-ল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ঘন ঘন বজ্রঝড় সৃষ্টি হয়।
বায়ূতে কার্বনডাই অক্সাইড এবং সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে গেলে বজ্রপাতের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ধূলিকণাগুলো মেঘের ভেতরে ঘর্ষণ বাড়িয়ে বৈদ্যুতিক চার্জ জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
মেঘের ভেতরে থাকা জলীয়বাষ্প যখন উপরে ওঠে, তখন বরফ কণা বা তুষারের সাথে সংঘর্ষ হয়। এতে মেঘের উপরের অংশে পজিটিভ এবং নিচের অংশে নেগেটিভ চার্জ জমা হয়। এই দুই স্তরের মধ্যে যখন বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক আধানের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তখন বায়ুম-লের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ নির্গত হয়। আর এটিই হচ্ছে ‘বজ্রপাত’।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে বাড়ছে বজ্রপাতের হার। বজ্রপাতের ফলে বহু মানুষের মৃত্যুঘটে। বিশেষত: গ্রামাঞ্চলে কৃষিজীবী, প্রান্তিক মানুষ বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করছেন। এই হার ক্রমশ: উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বজ্রপাতে মৃত্যু নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। এর ক্ষয়-ক্ষতি ও প্রতিকার নিয়েও খুব একটা ভাবা হয় না। তবে এক হিসেবে দেখা গেছে, গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটেছে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষ। প্রতিবছর গড়ে বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে ৩শ’ জনের বেশি। গত দশ বছরের মধ্যে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪শ’ ২৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩শ’ ১৯ জন। ২০২৩ সালে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছে ৩শ’ ২২ জন। ২০২৪ সালে মারা গেছেন ২শ’ ৯৭ জন। ২০২৫ সালে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় বজ্রপাতের হার কিছুটা কম ছিলো। এ বছর মারা গেছেন ১শ’ ৭৩ জন। তবে ওই বছর ২৮ এপ্রিল একদিনেই সর্বোচ্চ ১৯ জন কৃষকসহ ২৩ জন মানুষ বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেন।
চলতিবছর ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছে ৬০ জনের মতো। গত ১৮ এপ্রিল ৭টি জেলায় বজ্রপাতে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে অন্তত: ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, বজ্রপাতে নিহতদের ৭০ শতাংশই প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী। পেশাগতভাবে তারা কৃষক। ক্ষেত-খামারে কাজ করতে গিয়ে অধিকাংশ সময় তারা বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করছেন। বজ্রপাত এখন হয়ে উঠেছে কৃষিজীবীদের বড় একটি পেশাগত ঝুঁকি। খোলা মাঠে কাজ করার সময় তারা এই দুর্ঘটনার শিকার হন।
আবহাওয়া দফতর সূত্র জানিয়েছে, দেশে কিছু বজ্রপাতের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
এই প্রাণহানির দায় কার : কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মানুষ বজ্রপাতে মৃত্যুকে দৈব কারণ কিংবা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর ক্রম:বৃদ্ধি কি দৈব কারণে ঘটছে? এটিকে কি ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেয়া যায়?
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করছেন-এমন বিশ্লেষকরা জানান, বজ্রপাত ক্রম:বৃদ্ধির কারণ বৈশ্বিক তাপমাত্রার ক্রম:বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ কোনোভাবে দায়ী নয়। দায়ী বৃহৎ শিল্পোন্নত দেশগুলো। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে বিশ্বে এক নম্বরে রয়েছে চীন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ দায়ী এই দেশটি। দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১১ থেকে ১২ শতাংশ নিঃসরণ করে এই দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র মাথাপিছু কার্বন নির্গমনের শীর্ষে রয়েছে এই দেশ। ভারত হচ্ছে তৃতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরণ ঘটাচ্ছে। দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নির্গমনের মাত্রা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং রাশিয়া যৌথভাবে রয়েছে চতুর্থ স্থানে। এসব দেশ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরণ ঘটায়। ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের বনাঞ্চল উজাড় এবং শিল্পায়নের কারণে এসব দেশ শীর্ষ ১০ কার্বন নিঃসরণকারী দেশের তালিকায় রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে কার্বন নিঃসরণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী। যদিও এখন দ্রুত শিল্পায়নের কারণে চীন ও ভারতের নির্গমন দ্রুত বাড়ছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো খুব সামান্য (০.৫% এর কম) কার্বন গ্যাস নির্গমন করেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়, শিল্পোন্নত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত অপরাধের জন্য দায়ী শিল্পোন্নত দেশ। অথচ ধুঁকছে বাংলাদেশ। বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ সৃষ্টি করছে শিল্পোন্নত দেশ। অথচ বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করছে বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষক, প্রান্তিক মানুষ। বাংলাদেশ কার্বণ নিঃসরণের মতো অপরাধ না করেও মাশুল গুনছে প্রাণ দিয়ে।
নেই আইনি সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ : শিল্পোন্নত দেশের পাপের ফলে বাড়ছে বজ্রপাত। এই বজ্রপাতে হরহামেশই প্রাণ হারাচ্ছেন দেশের দরিদ্র প্রান্তিক মানুষ। মানব সৃষ্ট এই কৃত্রিম সঙ্কটের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। নেই ভুক্তভোগী মানুষের আইনি সুরক্ষা। বজ্রপাতে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বিষয়টিকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ গণ্য করে সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে যৎসামান্য অর্থ সহায়তা দেয়া হয় মাত্র।
অথচ জলবায়ুর প্রত্যক্ষ ‘ভিকটিম’ এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু তহবিল পাচ্ছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ (জিসিএফ) জলবায়ু তহবিল জলবায়ু অর্থায়নের সর্ববৃহৎ মাধ্যম। এ থেকে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো অর্থসহায়তা লাভ করে। অথচ এই অর্থ বজ্রপাতে মৃত্যুবরণকারী কৃষক পরিবারের ভাগ্যে জোটে না। এমনকি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের কোনো আইনি কাঠামো নেই। বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের দায়-দায়িত্ব গ্রহণের আইনি বাধ্যবাধকতা সৃষ্টিতে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
জবাব মেলেনি সেই রুলের : বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- এই মর্মে ২০২৫ সালের ২০ মে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি সিকদার মাহমুদ রাজির তৎকালীন ডিভিশন বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। রুল জারির পাশাপাশি কিছু নির্দেশনাও প্রদান করেন। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, (১) বজ্রপাত মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপের মূল্যায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন। (২) পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে বজ্রপাত রোধে গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতি প্রতিবেদন হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল। (৩) বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টি, আগাম সতর্কবার্তা প্রদান, এবং হাওর-বাঁওড় এলাকায় পর্যাপ্ত বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’ জনস্বার্থে এ রিট করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব। গতকাল (বুধবার) তিনি বলেন, নির্দেশনার পাশাপাশি রিটে আমরা বজ্রপাতে মৃত্যুরোধ এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে আইন প্রণয়নেরও নির্দেশনা চেয়েছি। কিন্তু বছর ঘুরে এলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেনি। কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদনও আদালতে দাখিল করেনি। তবে শিঘ্রই আমরা কমপ্লায়েন্সের জন্য লিস্টে আনবো-মর্মে জানান ব্যারিস্টার পল্লব।