Image description
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে সাম্প্রতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিত্য পণ্যের দাম আরও বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিকট ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বৈশ্বিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্য, দেশে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় এবং বিদ্যমান জ্বালানি সরবরাহসংকট। সরকার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বিশ্লেষণ এসেছে ওই সিদ্ধান্তের মাত্র নয় দিনের মাথায়, যা অর্থনীতিতে বাড়তি ব্যয় চাপের ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে এর প্রভাব সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি (বছরভিত্তিক মূল্য এবং মজুরি) বেড়ে গড়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানির মূল্য বাড়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতিতে এক ধরনের ধাক্কা দেখা দিতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি এমন একটি উপাদান যা প্রায় সব খাতে ব্যবহৃত হয়। তাই এর মূল্য বাড়লে অর্থনীতির সর্বত্র এর প্রভাব পড়ে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জ্বালানির মূল্য বাড়ার পর ইতোমধ্যে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে সবজি ও মসলার মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ প্রবণতা দেখা গেছে। তবে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য যেমন মাংস, মাছ, ডিম মূল্যস্ফীতির প্রধান অবদানকারী হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির কারণে খাদ্যপণ্য এবং পোশাক-জুতার দাম কিছুটা বেড়েছে।

এ সময় সাধারণত ভোক্তারা বেশি খরচ করেন, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্য এবং দেশি খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অবদান আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে আমদানিনির্ভর অখাদ্য পণ্যের ক্ষেত্রে এ অবদান কিছুটা কমেছে। মজুরি বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় খুব বেশি বাড়েনি। গত মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে এলেও মজুরি বৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সামান্য হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যচাপ কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।