পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে জ্বালানি লোডিং। অপেক্ষা এখন কবে মিলবে কাঙিক্ষত সেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। আর পূর্ণ সক্ষমতায় অর্থাৎ ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে জ্বালানি লোডিং ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে চলবে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
প্রশ্ন হলো— কীভাবে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে? কয়লা, গ্যাস কিংবা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই কি এর উৎপাদন কার্যক্রম? উত্তর হলো- না।
রূপপুরে জ্বালানি হিসেবে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম দণ্ড বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে সময় লাগবে ৩০ দিন।
এরপর শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। এ পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রি-অ্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন। পরীক্ষা শেষে রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন। রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ৩ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হবে।
সেই তাপ রি-অ্যাক্টরের প্রাইমারি সার্কিটের পানি গরম করবে। এই গরম পানি স্টিম জেনারেটরে প্রবেশ করে যেখানকার হিট এক্সচেঞ্জ টিউবের মাধ্যমে সেকেন্ডারি সার্কিটের পানিকে বাষ্পে রূপান্তরিত করবে এবং তা আবার রি-অ্যাক্টরে ফিরে আসবে। প্রথম ও দ্বিতীয় সার্কিটের বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও এ সময় সম্পন্ন হবে।
ছবি: রোসাটমএসব পরীক্ষা শেষে রি-অ্যাক্টরের ক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে এবং উৎপন্ন বাষ্প টারবাইনে প্রবেশ করানো হবে, যার মাধ্যমে টারবাইন চালু করা হবে। টারবাইন থেকে নির্গত বাষ্প কনডেন্সারে প্রবেশ করে, যেখানে তৃতীয় কুলিং সার্কিটের পানি, যা কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে ঠান্ডা থাকে, সেটি হিট এক্সচেঞ্জ টিউবের মাধ্যমে বাষ্পকে তরলে রূপান্তরিত করবে। অর্থাৎ পানি থেকে বাষ্পে রূপান্তর হয়ে তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরে কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে সেই বাষ্প পানিতে পরিণত হয়ে আবার ব্যবহার হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে। এভাবেই চলতে থাকবে।
ছবি: রোসাটমটারবাইন চালু হওয়ার পর টারবাইন ও জেনারেটরের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে। এরপর জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ বা সংযুক্ত করা হবে। আর এভাবেই মিলবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ।
তেজস্ক্রিয়দার ঝুঁকি এড়াতে এই পুরো প্রক্রিয়া চলবে একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
বিদ্যুৎ মিলবে কতদিন
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।
২০২৭ সালের জুনে একই সক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ওই বছর সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।