ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গত এক মাসে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের নির্দিষ্ট জায়গায় আরও ১৪ জন শিশু চিকিৎসাধীন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে এক মাসের মধ্যে চিকিৎসাধীন হাম রোগে তিনজন শিশু মারা গেছে। বর্তমানে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের নর্থ কেবিনের তিনটি রুমে ১৪ শিশুকে হাম রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, হাম রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে অল্প বয়সী শিশুরা। আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউ প্রয়োজন হলে তাদের জেনারেল আইসিইউতে রাখা যায় না। শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ প্রয়োজন হয়। তবে হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত আইসিইউর তেমন প্রয়োজন পড়ে না, বেশি প্রয়োজন হয় অক্সিজেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অক্সিজেনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে।
ঢামেক হাসপাতালের এনআইসিইউ (NICU) নবজাতক শিশুদের জন্য বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট। এখানে অসুস্থ, অপরিণত বা জটিল সমস্যায় আক্রান্ত নবজাতকদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়। জন্ম থেকে এক মাস বয়সী অসুস্থ শিশুদের এখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে এনআইসিইউতে আসন সংখ্যা ৩০-এর বেশি। প্রতিদিন এই হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে অস্ত্রোপচার ও স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ নবজাতক জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই দুই-একজন অপরিণত, কম ওজনের বা অন্য রোগে আক্রান্ত থাকে। এ ধরনের নবজাতকদের এনআইসিইউ সেবা প্রয়োজন হয়।
এছাড়া ভূমিষ্ঠ নবজাতকসহ আউটডোর-ইনডোরে প্রাথমিক চিকিৎসা ও হাসপাতালে ভর্তি মিলিয়ে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ শিশু নানা রোগের চিকিৎসা নেয়। জন্ম থেকে এক মাস বয়সী কোনো নবজাতক হামজনিত কারণে আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হলে তাকে এনআইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (PICU) শিশুদের জন্য বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট। এখানে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়। দেড় মাস বয়স থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুদের এখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সার্জারি করা শিশুদের এখানেই রাখা হয়।
এই ইউনিটে মোট আসন সংখ্যা ১৬টি। তবে দুই রুম মিলে বর্তমানে চালু আছে ১৩টি।
দেড় মাস থেকে ১২ বছর বয়সী কোনো শিশু হামজনিত কারণে আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হলে তাকে পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হবে। তবে জানা মতে, ঢাকার অন্য কোনো সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে এমন পেডিয়াট্রিক আইসিইউ নেই, যদিও আরও দু-একটি সরকারি হাসপাতালে চালুর পরিকল্পনা ছিল।
এদিকে ঢামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের একজন সাবেক সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, হামের ভাইরাসটি এক রকম করোনা ভাইরাসের মতো। বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বাসা-বাড়ির ফ্লোরে, টেবিল-চেয়ারে দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত ভাইরাসটি থাকে। এজন্য হাম রোগীকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে। সেই জায়গাটি সবসময় পরিষ্কার করতে হবে।
হামের উপসর্গ বা হামে আক্রান্ত হলে খুব বেশি সমস্যা নয়, একটু জ্বর, একটু কাশি থাকে। চিকিৎসকদের পরামর্শে রোগীকে বাসায় রেখে ওষুধ খেয়ে বহু হামের রোগী সুস্থ হচ্ছে। এই জন্যই বলছি, বাতাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ, পাশাপাশি ফ্লোর, আসবাবপত্রসহ অন্যান্য জায়গায় অবস্থান করে থাকে। তাই সবসময় সবকিছু পরিষ্কার করে রাখতে হবে।
ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবজাতক হাম রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে তাদের তেমন কোনো ভয় নেই, তারা এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। তবে হামের রোগীরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, ডায়রিয়া হচ্ছে, এছাড়া চোখ লাল হয়ে গেছে, তখনই সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই তাদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধ নিয়মিত খাওয়াতে হবে এবং বাচ্চাকে বাইরে, বিশেষ করে রোদের মধ্যে নেওয়া যাবে না। বর্তমানে যাদের হাম দেখা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশের বয়স ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে।
এদিকে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে গণমাধ্যমকে জানান, হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা) দেশে আরও পাঁচ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল চার শিশুর। এ সময়ে সারাদেশে আরও ১ হাজার ৩৫৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সিলেটে হাম শনাক্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ঢাকায়, খুলনায়, রাজশাহীতে ও সিলেটে হামের উপসর্গে একটি করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ২২০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৪৪ শিশু।