গত ১২ এপ্রিল বিকেল আনুমানিক ৪টা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী বেড়িবাঁধ এলাকার একটি সিসিটিভির ভিডিওতে দেখা মেলে এক দুর্ধর্ষ ঘটনার। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন যুবক হঠাৎ দৌড়ে আসছে। পেছন থেকে তাকে ধাওয়া করছে আরও বেশ কয়েকজন যুবক। একপর্যায়ে ওই যুবককে ধরে ফেলে তারা। এরপর তাকে রাস্তায় ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। কুপিয়ে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
যে কেউ স্ক্রিনে হঠাৎ চোখ রেখে মনে করতেই পারেন, এটি হয়তো সিনেমার কোনো দৃশ্য। কিন্তু না, বাস্তবেই দিনদুপুরে রাস্তায় ফেলে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইমন নামের ওই যুবককে।
পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে এলেক্স ইমন গ্রুপের মূলহোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে অন্য আরেকটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলেক্স ইমন গ্রুপ ও আরমান-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরেই দুই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত।
এর ঠিক চারদিনের ব্যবধানে গত ১৬ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে ফের খুনের ঘটনা ঘটে। মারামারি ও আর্থিক লেনদেনের বিরোধের জেরে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) নামের একজনকে।
শুধু এলেক্স ইমন বা লম্বু আসাদুলের ক্ষেত্রেই নয়—মোহাম্মদপুরে খুনখারাবির এ ধরনের চিত্র এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অপরাধ চক্রের এই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে নিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি ও শত শত অপরাধীর গ্রেফতারেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মোহাম্মদপুরের অপরাধ জগৎ। এই অপরাধীদের দৌরাত্ম্য থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ রাখতে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যেন ‘গোলকধাঁধায়’ পড়েছে।
মোহাম্মদপুর এলাকা ভাগ করে নিয়ে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে ১৬টি গ্যাং। এই ১৬ গ্যাংয়ে রয়েছে ২৫১ জনের বেশি সদস্য।—গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য
নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি অপরাধচক্রের লাগাম টানতে সবশেষ গত ১৯ এপ্রিল রাতে বেশ আটঘাট বেঁধে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঠিক তার আগমূহূর্তেই পূর্বশত্রুতার জেরে আলম (২৭) নামের এক যুবককে ধাওয়া করে বেশ কয়েকজন যুবক। পরে তাকে একটি গলির মধ্যে নিয়ে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রায়েরবাজারের কিশোর গ্যাং পাটালী গ্রুপের প্রধান ও ফালান গ্রুপের প্রধানের মধ্যে পূর্বশত্রুতা ছিল। এরই জেরে আলম নামের যুবককে একা পেয়ে বিরোধী গ্রুপের সদস্যরা তাকে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে।
মোহাম্মদপুর এলাকাটির মোট আয়তন মাত্র ৭ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটার। সেখানে শুধু পাটালী গ্রুপ, ফালান গ্রুপ, এলেক্স ইমন গ্রুপ বা আরমান-শাহরুখ গ্রুপের রাজত্বই চলে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, মোহাম্মদপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত অর্ধশত গ্যাংয়ের আধিপত্য রয়েছে।
তবে, গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সম্পূর্ণ মোহাম্মদপুর এলাকা ভাগ করে নিয়ে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে ১৬টি গ্যাং। এই ১৬ গ্যাংয়ে রয়েছে ২৫১ জনের বেশি সদস্য। যারা নিয়মিত আধিপত্যের লড়াইয়ে অরাজকতা চালিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো মোহাম্মদপুর।
কত সদস্য নিয়ে কোন এলাকা কার নিয়ন্ত্রণে?
মোহাম্মদপুর থানার রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকায় রাজত্ব করছে ‘পাটালী গ্রুপ’। যাদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ১৬ জন। চাঁদ উদ্যান বেড়িবাঁধ ও চাঁদ উদ্যান ভাঙ্গা মসজিদ এলাকায় ‘লেভেল হাই গ্রুপ’। যাদের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন।
নবোদয়, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা হাউজিং, বেড়িবাঁধসহ সমগ্র মোহাম্মদপুর এলাকায় রাজত্ব করছে ‘আনোয়ার গ্রুপ’। এ গ্যাংটির সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন। শহীদ বুদ্ধিজীবী ১নং গেট, বোর্ডঘাট, বেড়িবাঁধ এলাকার রাজত্ব করছে ‘ফরহাদ গ্রুপ’। গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন।
বেড়িবাঁধ রোড, তিন রাস্তার মোড়, বুদ্ধিজীবী রোড, রায়েরবাজার, বসিলা রোড এলাকায় ‘আর্মি আলমগীর’ ও ‘নবী গ্রুপ’র রাজত্ব চলছে। রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী রোড, আজিজ খান রোড, সাদেক খান রোডসহ পুরো রায়েরবাগ এলাকায় ‘ডাইল্লা গ্রুপ’ রাজত্ব করছে। গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন। বাঁশবাড়ি রোড, নুরজাহান রোড, মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড, নবোদয় রোড এলাকায় রাজত্ব করা ‘এলেক্স গ্রুপ’র সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন।
৪০ ফিট বসিলা রোড, চাঁদ উদ্যান ও বেড়িবাঁধ এলাকায় ১৫ থেকে ২০ সদস্যের রয়েছে ‘আকবর গ্রুপ’। চন্দ্রিমা হাউজিং, লোহার গেট, নবোদয়, বেড়িবাঁধ এলাকায় ‘গাংচিল গ্রুপ’র রয়েছে ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য।
১৬ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত এই সাতদিনে তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৪২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় গ্রেফতার করা হয় ১৬৮ জনকে।—ডিএমপির তথ্য
ঢাকা উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, বেড়িবাঁধ, তিন রাস্তার মোড়, চাঁদ উদ্যান, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রয়েছে ‘ল ঠেলা গ্রুপ’। যাদের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। নবীনগর হাউজিং, বেড়িবাঁধ, নবোদয়, চাঁদ উদ্যান এলাকায় রয়েছে ১৪ থেকে ১৫ সদস্যের ‘আশরাফ গ্রুপ। রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও আশপাশ এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘স্টার বন্ড’ গ্রুপ। এদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন। চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান ও আশপাশ এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১৫ সদস্যের ‘ভাইব্বা ল কিং’ গ্রুপ।
এছাড়া সুচনা কমিউনিটি সেন্টার, কৃষি মার্কেট, শিয়া মসজিদ, শ্যামলী ক্লাব মাঠ এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘চেতালেই ভেজাল’ গ্রুপ। এদের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। ঢাকা উদ্যান, বেড়িবাঁধ রোড, চাঁদ উদ্যান, নবীনগর হাউজিং এলাকায় ‘টক্কর ল গ্রুপ’র সদস্য ১২ থেকে ১৫ জন। ঢাকা উদ্যান, নবীনগর হাউজিং, নবোদয় হাউজিং এলাকায় রাজত্ব করছে ‘ঘুটা দে গ্রুপ’। এ গ্রুপটিরও রয়েছে ১৩ থেকে ১৪ জন সদস্য।
মোহাম্মদপুরে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এসব গ্রুপের সদস্যরা মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, মাদক সেবন-বিক্রি, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই, ইভটিজিং ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এছাড়া রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারা অংশ নেয়, কখনো কখনো চুক্তিতে সেসব কর্মসূচিতে লোকবলও সাপ্লাই করে।
ওই এলাকার ১৬টি গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বেরিয়ে এসেছে বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পদধারী একাধিক নেতার নাম। এছাড়া স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী, ক্যাডার ও কিলার হিসেবে পরিচিতদের নামও রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের হাতে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনাসহ নানান ব্যবস্থা নিলেও বারবারই এসব অপরাধী চক্রকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হতে হচ্ছে। ফলে মোহাম্মদপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করা আদৌ সম্ভব হবে কি না—এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে।
তাদের ভাষ্য, এসব গ্যাংয়ের পেছনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পদধারী বিভিন্ন নেতার সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
সরেজমিনে এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জানতে চাইলে তাদের অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তারা জাগো নিউজকে জানান, এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কথা বললে যে কোনো সময় তাদের ওপর হামলা হতে পারে। তাদের ক্ষতি করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুরের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রায় প্রতিটি গ্যাংয়ের প্রধান ও সদস্যরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে। যে কারণে অনেকক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চাইলেও তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না। আবার যেসব অপরাধী গ্রেফতার হয়ে নামেমাত্র সাজা শেষে বা অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে জামিনে বের হয়ে আসছে তারা আবারও এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে গ্রেফতার বা সাজার যে ভয় সেটাও তাদের নেই।
যে দু-একটি বড় ঘটনা ঘটেছে সেগুলো বাইরে থেকে লোক এসে ঘটিয়ে আবার চলে গেছে। তাদের অন্য জায়গায় শেল্টার রয়েছে। সেজন্য আমরা ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেফতার করে আসামিদের আইনের আওতায় এনেছি।—উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান
এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও অপরাধ জগতের বড় বড় হাত তো তাদের মাথার ওপরে থাকছেই। ফলে পুরো মোহাম্মদপুর এলাকায় যেন ‘ভয়কে জয় করে’ অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছে।
এসব অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ এলাকার বাসিন্দারা মনে করেছেন, অপরাধ দমন ও অপরাধীদের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে অতীতের মতো আবারও ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যা পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, দেশজুড়ে যখন ক্রসফায়ারের নীতি চালু ছিল, তখন মোহাম্মদপুরেও অপরাধীদের হাঁকডাক কম ছিল। তারা এসব অপরাধ চক্রের অত্যাচারের বিভিন্ন চিত্র ও নমুনা তুলে ধরেন।
নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পরিসংখ্যান
রাজধানীর ছয়টি থানা নিয়ে গঠিত তেজগাঁও বিভাগ। তেজগাঁও জোনের অন্তর্ভুক্ত থানাগুলোর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা, শেরেবাংলা নগর থানা, আদাবর থানা, তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা ও হাতিরঝিল থানা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, ১৬ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত এই সাতদিনে তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৪২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরমধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় গ্রেফতার করা হয় ১৬৮ জনকে।
মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানার মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ থানা এলাকাটি বড় হওয়ায় আমরা একযোগে সব জায়গায় অভিযান চালাতে পারি না। তবে রায়েরবাজার, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান এলাকায় নিয়মিত অভিযান হয়। অভিযানে বেশ ভালো সংখ্যক ছিনতাইকারী ও অপরাধী ধরা হয়। পরে তাদের আইনের আওতায়ও আনা হয়।’
‘নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। কিন্তু যে দু-একটি বড় ঘটনা ঘটেছে সেগুলো বাইরে থেকে লোক এসে ঘটিয়ে আবার চলে গেছে। তাদের অন্য জায়গায় শেল্টার রয়েছে। সেজন্য আমরা ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেফতার করে আসামিদের আইনের আওতায় এনেছি। আমরা চেষ্টা করছি, যেন বাহির থেকে কেউ এসে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে।’
উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান আরও বলেন, ‘আমরা চেকপোস্টগুলো আরও জোরদার করবো। আমাদের চিরুনি অভিযানও আরও জোরদার করা হবে। মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধচক্র যেন আরও নিয়ন্ত্রণে আসে সে বিষয়ে কাজ করবো।’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় এটি বাংলাদেশের বাইরের কোনো দেশ কিংবা বাংলাদেশের মধ্যে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ। কারণ, দীর্ঘ সময়েও নানানভাবে এ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। কারণ, ব্যবস্থাগুলো যেভাবে নেওয়া দরকার সেভাবে নেওয়া হচ্ছে না।’
যে বা যারা মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাদেরই কেউ কেউ এসব অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে জড়িত। অর্থাৎ, অপরাধীদের তারা সুযোগ করে দেন। সুযোগটা কেন করে দেন? কারণ, এ থেকে তারা আর্থিক সুবিধা নেন।—ড. তৌহিদুল হক
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় খুন বা অপরাধের ঘটনাগুলো বেড়ে গেলে, গণমাধ্যমের চাপ ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্বশীলরা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ব্যবস্থা নেয় তা যথাযথ হয় না।’
‘মোহাম্মদপুরে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে জেনেভা ক্যাম্পকে অপরাধমুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, মোহাম্মদপুরের যতগুলো গ্যাং আছে, সেটা কিশোর গ্যাং হোক কিংবা অন্য অপরাধীদের গ্যাং—এসব গ্যাংয়ের সদস্য ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
‘তবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া মানে এমন নয় যে, পুলিশ গ্রেফতার করলো, আবার দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এলো। মামলার যে বিবরণ কিংবা অপরাধের যে ধরন সেগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কেননা, আমরা দেখেছি মামলার বিবরণ বা উপস্থাপনের কিছু ফাঁক থাকে, যা আসামিকে সহজে জামিনযোগ্য করে তোলে।’
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘যে বা যারা মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাদেরই কেউ কেউ এসব অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে জড়িত। অর্থাৎ, অপরাধীদের তারা সুযোগ করে দেন। সুযোগটা কেন করে দেন? কারণ, এ থেকে তারা আর্থিক সুবিধা নেন। যে কারণে অপরাধগুলো হয়, আর সেসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে যে অর্থ সংগ্রহ হয় তার একটা অংশ তাদের দেওয়া হয়।’
‘মোহাম্মদপুরে সুবিধাবঞ্চিত বা প্রান্তিক মানুষের বসবাসও দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধ প্রবণতা চলতে থাকার একটি বাস্তবতা। এটি সেখানকার একটি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও। যে কারণে অনেকে বিভিন্ন জায়গায় অপরাধমূলক কাজ করে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এর বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের ব্যবস্থা ততটা জোরালো হচ্ছে না। হুটহাট অভিযান পরিচালনা করেও লাভ নেই। চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। অভিযুক্ত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
এ অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ‘গ্রেফতার ও আইনগত ব্যবস্থার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিবেচনা বা ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো যখন বিবেচনা করা হয় তখন সেই ব্যবস্থা দিয়ে আসলে কোনো অর্থবহ প্রতিরোধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় না। এসবও মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ।’