Image description

বৈরী আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট ও বন্যার ঝুঁকিতে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের ধানচাষি ও জেলার কৃষকরা। কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। অন্যদিকে নিচু জমিতে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। টানা বৃষ্টি হলে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে পানির চাপ আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জের কৃষকরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।

এপ্রিলের শুরুতেই অতিবৃষ্টিতে নিচু জমির ধান তলিয়ে গেছে। এর সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা ধান শুকাতে পারছেন না। বজ্রপাতের ভয়ে হাওরে ধান কাটার শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। আবার অতিবৃষ্টিতে অনেক ক্ষেতে কোমরসমান পানি জমে আছে।

 
জেলার সুমেশ্বরী, যাদুকাটা, মনাই, খাসিয়ামারা, চেলা ও পিয়াইনসহ সাতটি সীমান্ত নদীতে উজানের পানির প্রবাহ বেড়েছে। এতে হাওরাঞ্চলের লাখো কৃষক উদ্বেগে সময় পার করছেন। সামনে আরও চারদিন ধমকা হাওয়া ও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষকরা পড়েছেন বড় বিপাকে।
 
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের সুখাইড় গ্রামের কৃষক সীতেশ দাস বলেন, নিচু জমি নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা। জমিতে পানি জমে থাকায় মেশিন দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি বেশি। খলায় রাখা ধানও শুকানো যাচ্ছে না।
 
বাগবাড়ি গ্রামের কৃষক সুবল দাস বলেন, খলার ধান আর ক্ষেতের ধান; দুই দিক থেকেই সমস্যায় আছি। বৃষ্টির কারণে ধান শুকানো যাচ্ছে না, আবার নিচু জমির ধান কাটা যাচ্ছে না। এমন বৈশাখ আগে কখনো দেখিনি। এবারের বৈশাখ যেন কৃষকের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
 
জয়শ্রী গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, গত ৬-৭ বছর বৈশাখ ভালো গেলেও এবার শুরু থেকেই দুর্যোগ। প্রথমে শিলাবৃষ্টি, পরে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা; সব মিলিয়ে কাঁচা ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই।
 
 
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ৫ থেকে ১২ এপ্রিল এবং ২৩ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হাওর অববাহিকা ও উজানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু ও বৌলাই নদীর পানি দ্রুত বেড়েছে। ২৮ এপ্রিলের মধ্যে হাওরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় ক্ষেতের ৮০ শতাংশ ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গে কাটার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
 
তবে সুরমা নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ১ দশমিক ৭৬ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়া ও বজ্রপাতের কারণে ধান কাটার শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে এবং মজুরি বেড়েছে। জলাবদ্ধ জমির ধান কাটতে শ্রমিক ছাড়া উপায় না থাকায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করছেন।
 
ভারতের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বাংলাদেশের উজানে মেঘালয় রাজ্যে ২৭ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত মাঝারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে স্বাভাবিকভাবেই সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
 
ম্যাথোলজি প্রাই ম্যাথোলজি অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম রিসার্চ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের এমডি আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ জানান, ২৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত পাঁচ দিনে সুনামগঞ্জে ৬০ থেকে ১৬০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে।
 
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরও কালবৈশাখীঝড় ও বজ্রপাতের বার্তা দিয়েছে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ সজিব আহমদও জানিয়েছেন, আগামী চারদিন দমকা হাওয়া ও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
 
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, কৃষকদের সহায়তায় সরকার কাজ করছে। ধান কাটার মেশিন চালাতে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। তবে হাওরাঞ্চলের সাত জেলাতেই একসঙ্গে ধান কাটার কাজ চলায় শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।