মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নতুন প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন। হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরান ৩টি শর্ত দিয়েছে। তা মানতে নারাজ ট্রাম্প। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া এবং যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ইরান যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিয়ে ট্রাম্পের আপত্তি রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
সপ্তাহান্তে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দেয়। তাতে ইরান যে তিনটি শর্ত দিয়েছে তা হলো ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে হবে, দেশটির বন্দরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। তেহরান জানায় এর বদলে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে নেয়া যেতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমান এবং পাকিস্তানে আলোচনাকারীদের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল অচলাবস্থা ভেঙে আবার আলোচনার পথ খুলে দেয়া। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা দল ইরানের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান। ঠিক কেন ট্রাম্প এতে সন্তুষ্ট নন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের প্রস্তাবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পিছিয়ে দেয়ার বিষয়টি বড় কারণ হতে পারে।
ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া যাবে না। তার প্রশাসনের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল তেহরানের এই সক্ষমতা রোধ করা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও এমন কোনো চুক্তি মানতে নারাজ, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা তাদের এভাবে পার পেতে দিতে পারি না। যে কোনো চুক্তি এমন হতে হবে, যাতে তারা কোনো সময়ই পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে এগোতে না পারে।
হোয়াইট হাউস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের প্রস্তাব নিয়ে মন্তব্য করেনি। তবে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে অবহিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে। এর আগে ট্রাম্প ইরানকে ফোনে আলোচনা চালানোর প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করবে না। আমাদের লাল রেখা স্পষ্ট এবং প্রেসিডেন্ট এমন চুক্তিই করবেন যা আমেরিকার জনগণ ও বিশ্বের জন্য ভালো।
ইরানের ৩ শর্ত
তেহরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া হবে যদি- যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও তার বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ করা হয় ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী ধাপে নেয়া হয়।
ইরানের নতুন এই প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তীব্র বিতর্ক চলছে। প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান, কার হাতে বেশি প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা কার বেশি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের নেতৃত্ব এখনো তাদের আলোচকদের পারমাণবিক ইস্যুতে ছাড় দেয়ার অনুমতি দেয়নি, যা শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প নিজেও এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। গত সপ্তাহে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ইরান নিজের নেতা কে- সেটাই ঠিক করতে পারছে না! তারা কিছুই বুঝতে পারছে না! তিনি আরও বলেন, কট্টরপন্থীরা যুদ্ধক্ষেত্রে খারাপভাবে হারছে, আর তথাকথিত ‘মধ্যপন্থীরা’ আসলে তেমন মধ্যপন্থী নয়। তবে তারা কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। পুরো পরিস্থিতিটাই অদ্ভুত!
ট্রাম্পের ওপর চাপ
একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থায় রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের লক্ষ্য হলো ইরানকে তেল বিক্রি থেকে বিরত রাখা, যাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব হারায়। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে তেহরান তেল সংরক্ষণের জায়গা না পেয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে প্রণালি বন্ধ থাকায় ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেল ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, যা তার প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ তারা এই জলপথ ব্যবহার করে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। বিশ্বের অনেক দেশেই ক্ষোভ বাড়ছে। সোমবার আবারও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হয়েছে। কারণ এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়েছে। সার, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।