Image description

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনার ১২ বছর পূর্ণ হলো আজ সোমবার। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সংঘটিত এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচার প্রক্রিয়ার নানা ধাপ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও শাসন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল।

তবে ঘটনার এক যুগ পরও আপিল বিভাগে শুনানি শুরু না হওয়ায় বিচার কার্যকরের অনিশ্চয়তা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—বিচার কি কেবল রায়েই শেষ, নাকি তার বাস্তবায়নেই প্রকৃত অর্থ নিহিত?

এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্ট পর্যন্ত শেষ হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায়ে র‍্যাবের সাবেক ১৬ কর্মকর্তা এবং সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ মোট ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আরও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার এই দ্রুততা আপিল বিভাগে এসে থমকে গেছে। ২০১৯ সালে দণ্ডিতরা আপিল দায়ের করলেও সাত বছর পার হয়ে গেলেও এখনো শুনানি শুরু হয়নি। গত বছরের ২১ অক্টোবর মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় উঠলেও আসামিপক্ষকে সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়। এরপরও অগ্রগতি হয়নি। ফলে রায় কার্যকরের বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।

জানা গেছে, আপিলটি আসামিপক্ষ থেকে করা হয়েছে এবং তারা সারসংক্ষেপ জমা দিলে রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত দায়িত্ব পালন করবে। রাষ্ট্র চায় দোষীরা শাস্তি পাক, কিন্তু নিরপরাধ কেউ যেন শাস্তির শিকার না হয়। বিচারব্যবস্থার এই ভারসাম্য রক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে দীর্ঘসূত্রতা বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

এই মামলার প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় তা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা তখন মারাত্মকভাবে নড়ে যায়।

ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এই প্রক্রিয়া দেখায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা ছিল, তবে একই সঙ্গে এটি প্রশ্ন তোলে—কীভাবে এত বড় অপরাধের পরও একজন অভিযুক্ত সহজে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন?

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাত খুনের ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। সে সময় সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠা সরকারের জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

বিরোধী দলগুলো তখন অভিযোগ তোলে যে, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাত খুনের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অন্ধকার দিককে সামনে নিয়ে আসে। এই ঘটনা দেখিয়েছে, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে অস্বচ্ছ সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন তা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিচার হয়েছে—এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু বিচার কার্যকর না হলে সেই অর্জন ম্লান হয়ে যাবে।

আইন বিশেষজ্ঞরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, আপিল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে মামলা ঝুলে থাকা নতুন কিছু নয়। তবে যেসব মামলার সামাজিক গুরুত্ব বেশি, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। সাত খুনের মামলাটি এমনই একটি মামলা। আপিল শুনানি বিলম্বিত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত জটিলতা, মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আদালতের সময় সংকট দায়ী হতে পারে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকারের সামিল। ভুক্তভোগীদের পরিবার এক যুগ ধরে অপেক্ষা করছে। তাদের জন্য প্রতিটি দিনই মানসিক যন্ত্রণা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু রায় দেওয়া নয়, সেই রায় কার্যকর করা। 

এদিকে নিহতদের পরিবারের হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। তারা মনে করছেন, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় ন্যায়বিচার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের দাবি—দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকর করা হোক।

এই প্রেক্ষাপটে বিচারব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নও সামনে আসে। মামলার জট কমানো, গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিচারিক প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা—এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। সাত খুনের মামলাটি সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঘটে যাওয়া এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও, এর পেছনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় কতটা নিরূপণ হয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই যথেষ্ট নয়; এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি।

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা দেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিচার হয়েছে, কিন্তু বিচার কার্যকর না হওয়ায় সেই অর্জন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আপিল বিভাগে শুনানি শুরু এবং দ্রুত নিষ্পত্তি এখন সময়ের দাবি। কারণ, বিচার শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।