মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ভোগান্তি কমে আসছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে কমেছে ভিড়। দেশে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো এবং পাম্পে বাড়তি জ্বালানি তেল সরবরাহের পর পাল্টাতে শুরু করেছে পাম্পগুলোর চিত্র।
কয়েকদিন আগে যেখানে ২-৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি তেল নিতে হতো, সেখানে এখন ৪০ থেকে ৫০ মিনিট অপেক্ষা করে তেল পাচ্ছেন চালকরা। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বাইকসহ গাড়ি চালকদের। পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আতঙ্ক কমে যাওয়ায় চাহিদা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। এ ছাড়া, ফুয়েল অ্যাপ চালু, দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ বাড়ানোর কারণে চাপ কমেছে।
ওদিকে, যানবাহনের চাপ কমাতে এবার মোটরসাইকেলের পর ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকে ফুয়েল পাসের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। প্রাথমিকভাবে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ সিরিজের ব্যক্তিগত গাড়িকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।
গতকাল সরজমিন শাহবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিসে গিয়ে দেখা যায়, ফুয়েল পাস দেখে তেল দেয়া হচ্ছে। এ পাম্পে আগে বাইকাররা ২-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতেন। তবে গতকাল ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করেই জ্বালানি পেয়েছেন। একই চিত্র দেখা যায় মতিঝিলের রহমান, মেঘনা ও করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে। মতিঝিলের রহমান ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন মধুমিতা সিনেমা হল সংলগ্ন গলি দিয়ে কয়েক কিলোমিটার পার হলেও গতকাল দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। লাইনে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকের মতো কমে গেছে। একই চিত্র দেখা যায় তার পাশে থাকা মেঘনা ও করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে। দু’টি পাম্পে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলের লাইন আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে আর ব্যক্তিগত গাড়ির লাইনও আগের চেয়ে কিছুটা কম লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে তেল নিতে আসা চালকদের আগে প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম ও ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষা করতে হতো। তবে লাইনের দীর্ঘ সারি কমে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে তাদের মাঝে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মতিঝিলের রহমান ফিলিং স্টেশনে প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করে তেল পেয়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তারেক হোসেন। তিনি বলেন, আজ খুব বেশি সময় লাগেনি তেল নিতে। গত সপ্তাহে তেল নিয়েছিলাম তখন সাড়ে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল পেয়েছি। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ বাড়ায় চিত্র পাল্টাচ্ছে পাম্পগুলোতে। এখন একটু শান্তিতেই তেল নিয়েছি। অফিস নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। এইভাবে চললে ধীরে ধীরে পাম্পে ভিড় আরও কমবে বলে মনে হচ্ছে।
মৎস্য ভবনে রমনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, আগে এখানে মোটরসাইকেলের লাইন কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেলেও বর্তমানে তা কমে এসেছে অনেকাংশে। আগের মতো ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে না চালকদের। ৪০ মিনিট অপেক্ষা করেই পাওয়া যাচ্ছে জ্বালানি তেল। তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মোটরসাইকেলের সারি আগের চেয়ে অন্তত ৩ ভাগের ২ ভাগই কমে গেছে। আগে মোটরসাইকেলের সারি মহাখালী রেলক্রসিং পার হয়ে গেলেও এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কিছু দূর যায়। লাইনে আনুমানিক ৭০ থেকে ১০০ মোটরসাইকেল দেখা গেছে। মহাখালীর গুলশান মডেল সেন্টারেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। সেখানে শহীদ বীর উত্তম একে খন্দকার রোডের মোটরসাইকেলগুলোর লাইনও ১০০ মিটারের মধ্যেই ছিল। তাছাড়া, মহাখালী এলাকার অন্য পাম্পগুলোতেও খুব একটা ভিড় দেখা যায়নি।
রহমান ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত রাশেদ ইসলাম বলেন, গত চারদিন আগেও এখানে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে হয়েছে কিন্তু আজ ৪০ মিনিটেই পেয়ে গিয়েছি। ১ ঘণ্টার মধ্যে তেল পেলেই আমরা খুশি।
পরিবাগ মেঘনা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত সিফাত উল্লাহ বলেন, আমি ২৫ মিনিট অপেক্ষা করার পরই লাইনের কাছাকাছি চলে এসেছি। অথচ এখানে একসময় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল নিতে হয়েছিল। ফুয়েল পাস থাকায় মোটামুটি অল্প সময়ে পাওয়া যাচ্ছে তেল।
মেঘনা মডেল সার্ভিসের ম্যানেজার হাবিবুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, আগে আমাদের পাম্পে ২৭ হাজার লিটার তেল সরবরাহ হতো বর্তমানে সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার লিটার। সরবরাহ বাড়ায় পাম্পের দীর্ঘ লাইন ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এবার ফুয়েল পাসের আওতায় ব্যক্তিগত গাড়ি: জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা আনতে চালু করা ডিজিটাল ব্যবস্থা ‘ফুয়েল পাস’-এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। মোটরসাইকেলের পর এবার ব্যক্তিগত গাড়িকেও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ সিরিজের ব্যক্তিগত গাড়িকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্য সিরিজের গাড়িকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। খুব শিগগিরই ঢাকার সব ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়িতেও ফুয়েল পাসের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। সংশ্লিষ্টদের ফুয়েল পাস অ্যাপ ডাউনলোড বা নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধনের অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারবেন, আর আইওএস ব্যবহারকারীদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।
এর আগে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ও আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালু করা হয়। শুধু ‘হ’ ও ‘ল’ সিরিজের মোটরসাইকেলকে নিবন্ধনের সুযোগ দেয়া হয়। এরপর ১৮ই এপ্রিল পাইলট কার্যক্রম বাড়িয়ে ঢাকায় আরও ১৮টি পেট্রোল পাম্প যুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলা ও মহানগর এলাকায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেলকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা জানায় জ্বালানি বিভাগ। ২০শে এপ্রিল আরও ১৯শে জেলায় ফুয়েল পাস নিবন্ধন চালু করার কথা জানায় মন্ত্রণালয়।