Image description
সাইবার নিরাপত্তা আইন

জাতিসংঘের অধীনে কর্মরত মিতু আক্তার (ছদ্মনাম)। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন নাম্বার দিয়ে তাকে ফোন করে বিরক্ত করা শুরু করে একটি চক্র। পরের বছর ৬ই ফেব্রুয়ারি আপত্তিকর মেসেজ আসে তার মোবাইলে। এরপর তিনি বরিশালের কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দাখিল করেন। প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে সাকিব সাদিক নামের এক অপরাধীকে তার কর্মস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জব্দ করা হয় অপরাধ সংগঠনে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, সিম, মোবাইলসহ ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। পরে, মামলা তদন্ত করে অপরাধ সংগঠনে ব্যবহৃত ল্যাপটপ ডিভাইসসহ যাবতীয় ডকুমেন্ট ফরেনসিক পরীক্ষা করে পুলিশ।

অপরাধের সত্যতা পাওয়ায় গ্রেপ্তার সাকিব সাদিককে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলাটির বিচারকাজ চলছিল। কিন্তু গত বছরের ২২শে অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ৭টি ধারা এবং এসব ধারার অধীনে চলমান সব মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম বাতিল করে অন্তর্বর্র্তী সরকার। একইসঙ্গে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ৫০ ধারা সংশোধনের ফলে বাতিল হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারায় ইতিপূর্বে কারও সাজা হয়ে থাকলে, তা বাতিলযোগ্য এবং তদন্তাধীন মামলাগুলোও বাতিল হয়ে যায়। এমনকি এসব ধারার অধীন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দেয়া সব সাজা ও জরিমানাও বাতিল করা হয়। এর ফলে ওই আইনে অভিযুক্ত সাকিব সাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলাটিও বাতিল হয়ে যায়। মুক্তি পায় অভিযুক্ত সাকিব সাদিক।

প্রশ্ন হচ্ছে- বিগত শেখ হাসিনা সরকার এই আইনটাকে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ফলে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী যারা এই আইনের অধীনে মামলা করেছেন তাদের মামলাগুলোও বাতিল হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার আইনের কয়েকটি ধারা বাতিল করলেও যেসব প্রকৃত ভুক্তভোগীদের মামলা চলমান ছিল তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে এর সুবিধা নিচ্ছে অনেক অপরাধী। এই সম্পর্কে বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাইবার নিরাপত্তা আইন বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল নোমান যিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা এমন শতাধিক মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন। এই মামলাটিতেও তিনি ভুক্তভোগী নারী মিতু আক্তারকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, মিতু আক্তারের সাবেক স্বামীর বর্তমান শ্যালক সাকিব সাদিক। তিনি দুলাভাইয়ের মোবাইল থেকে মিতু আক্তারের ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও সংগ্রহ করে তা ফেসবুকে বিভিন্ন নামে ছড়িয়ে দেন। এই মর্মে মামলাও করেন মিতু আক্তার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকটি ধারা বাতিল করলেও চলমান মামলাগুলোর ব্যাপারে কোনো স্পেশাল প্রোভিসন দেয়নি। ফলে সব মামলাই বাতিল হয়ে গেছে। এর সুবিধা নিচ্ছে অপরাধীরা। কিন্তু সরকার বাক-স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে অপরাধীদেরকে সুরক্ষা দিচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিধানসমূহ বাতিল এবং নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার যৌন হয়রানির মামলাসমূহ বাদ দেয়া, প্রত্যাহার, অব্যাহতি বা খালাসের অনুমতি দেয়ার ফলে তা সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। এ ছাড়া নারীদের সহিংসতা ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বিরোধী বলে আমি মনে করি।

আইনজীবী নোমান আরও বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে বিচার পাচ্ছেন না প্রকৃত ভুক্তভোগীরা। এটা স্পষ্ট সংবিধানের লঙ্ঘন। এ কারণে আইনি প্রতিকার পেতে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা শিগগিরই এ সংক্রান্ত নির্দেশনা চেয়ে রিট দাখিল করবো। উচ্চ আদালতে আমরা অবজারভেশন চাইবো। যে সমস্ত ভোক্তভোগী সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে বিচার পাচ্ছেন না সে সম্পর্কে আমরা আদালতে স্কিম চাইবো। আমরা বলবো যেন, সাইবার যৌন হয়রানি, অনলাইন নির্যাতন, লিঙ্গভিত্তিক ডিজিটাল সহিংসতা এবং অনুরূপ অপরাধসমূহ অধ্যাদেশে উল্লিখিত সুরক্ষিত “বাক-সম্পর্কিত অপরাধ”-এর আওতাভুক্ত না করা হয়। যেসব মামলা বাদ/নিষ্পত্তি করা হয়েছে, সেগুলোর নথিপত্র তলব করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চাইবো।