Image description

জাল এফওসি, নকল ইউডি ও ভুয়া এইচএস কোড ব্যবহার করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানির অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরের স্পাইডার গ্রুপের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন তিনটি গার্মেন্টস নিট বাজার লিমিটেড, বটম গ্যালারি ও ট্রাউজার ওয়ার্ল্ডের নামে এই কাপড় আমদানি করা হয়। ছোট কারখানা, সীমিত শ্রমিক ও সীমাবদ্ধ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গত ছয় মাসে এই বিপুল পরিমাণ উন্নত কাপড় আমদানি করার তথ্য মানবজমিনের হাতে এসেছে। শুল্ক ছাড়ে আমদানি করা এসব কাপড়ের অধিকাংশই খোলা বাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের শ’ শ’ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিন প্রতিষ্ঠানের নামে গত ছয় মাসে অন্তত ৭৮ কোটি গজ কাপড় আমদানি করা হয়। যার বড় অংশই বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ বন্ড সুবিধার শর্ত অনুযায়ী আমদানি করা কাপড় ব্যবহার করে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানির বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা মানেনি। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অতি গোপনে শুল্ক ফাঁকির মহাযজ্ঞ চালিয়ে গেলেও সম্প্রতি বিজিএমইএ’র নজরে পড়ে যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটির কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চায় বিজিএমইএ। অবশ্য স্পাইডার গ্রুপ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার দাবি করেছে। যদিও গ্রুপটির বক্তব্য এবং বিজিএমইএ কর্মকর্তার বক্তব্যে মিল পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি তৈরি পোশাক শিল্পের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ তদন্তে এই তিন প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাপড়ের সঙ্গে তাদের কারখানার আয়তন ও শ্রমিক সংখ্যায় ব্যাপক গড়মিলের তথ্য উঠে আসে। বিজিএমএইএ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে ইস্যু হওয়া ইউডি বিশ্লেষণ করে তথ্যে গড়মিল ধরা পড়ে। পরে ৭ দিনের মধ্যে ৩টি গার্মেন্টসকে সন্দেহজনক আমদানির যথাযথ ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠায় বিজিএমইএ। ওই ৩টি চিঠি মানবজমিনের হাতে এসেছে।

চিঠিতে বলা হয়, বিজিএমইএ’র রেকর্ড অনুযায়ী গত ছয় মাসে আপনার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউডি ও ইউডি সংশোধনীর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৫৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৬০.৮৯ কেজি, ১৭ কোটি ৯৯ হাজার ৫৫২.৮৬ গজ এবং ২২ লাখ ৮১ হাজার ৬৫২.৬৬ মিটার কাপড় আমদানি করেছেন। আপনার ৯৪ হাজার ৮৫ বর্গফুট আয়তনের কারখানা ১,৫২৮ জন শ্রমিক দিয়ে পরিচালনা করে আসছেন। আপনার কারখানার প্রতিস্থাপিত মেশিনারিজের সংখ্যা অনুযায়ী উৎপাদন ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা নেই, তার প্রেক্ষিতে আমদানিকৃত কাপড়ের সঠিক ব্যবহার নিয়ে বিজিএমইএ’র ইউডি কমিটি বোধগম্য নহে। বিষয়টির সুস্পষ্ট করতে আগামী ৭ দিনের মধ্যে বিজিএমইএ’র ইউডি কমিটিকে অবহিত করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

পৃথক তিনটি চিঠিতেই কাপড়ের ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান থাকলেও একই অভিযোগ তোলা হয়। কাগজপত্র ঘেটে দেখা গেছে, স্পাইডার গ্রুপের ৩টি গার্মেন্টেসের নামে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড়ের মধ্যে রয়েছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৮ গজ, অপরদিকে ১ কোটি ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৭০ কেজি, এবং ৪২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮৯ মিটার। গজ হিসাব করলে যা- ৭৮ কোটি ২০ লাখ ৯৫ হাজার ১৮১ গজ হয়। যা গার্মেন্টস শিল্প ইতিহাসে নজিরবিহীন। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ কাপড় দিয়ে উৎপাদন চালাতে কমপক্ষে ৩০টি বড় গার্মেন্টস কারখানার সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন। বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে এই উৎপাদন সম্ভব নয়।

বিজিএমইএতে জমা দেয়া শতাধিক ঘোষণাপত্র ইউডি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্পাইডার গ্রুপের ৩টি গার্মেন্টস বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় উচ্চ কোয়ালিটির পলিয়েস্টার ডাইন ফেব্রিক, সিনথেটিক ফাইবার ফেব্রিক, পাইল ফেব্রিকের। যার এইচএস কোড ৫৪০৭.৫২, এইচএস ৬২০৪.৪৩, এইচএস ৬০০১.৯২। এই ধরনের কোডের কাপড় দিয়ে সাধারণত মহিলাদের বোরখা, ছাতা, ব্যাগ, টপ স্কার্ট, হিজাব, গাউন, পার্টি ড্রেস, সোফা, কুশন, বেডশিট তৈরি করা হয়। এসব কাপড় নিটিং ও ওভেন গার্মেন্টসের ব্যবহার হয় না।

এদিকে আমদানি করা কাপড় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের পোশাক তৈরি করেছেন এবং তা কোন দেশে রপ্তানি করেছেন তার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধা নিয়ে আমদানি করা কাপড়ের কাটিং রেজিস্ট্রার, কাটিং লে-চার্ড, ডেলিভারি চালান, প্যাকিং লিস্ট, ইনস্পেকশন সার্টিফিকেট ও শিপমেন্টের কাগজপত্র দেখতে চাইলে কর্তকর্তাদের কেউ তা এই প্রতিবেদককে জানাতে পারেনি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গার্মেন্টসগুলোর জাল এফওসিতে বন্ডের উপ কমিশনার, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, প্রধান সহকারীর স্বাক্ষর রয়েছে। এই জাল এফওসি আবার বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিতে বিদেশ থেকে আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে তা বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে, এমন কিছু ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডার তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। পরে ওই ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডারের কাগজপত্র জমা দিয়ে বন্ড সুবিধা নিয়ে কাপড় আমদানি চলমান রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

চিঠির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর মো. সাইফুল ইসলাম (অব.) মানবজমিনকে বলেন, আমরা ৩টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা যথাসময়ে তার জবাব দিয়েছেন। আমরা তাদের জবাবে সন্তুষ্ট হয়েছি। বিষয়টি ওখানেই মিটমাট হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ির কিছু নেই। আর তারা কাপড় আমদানি করে বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন তা আমরা বলিনি। তবে কী ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং সেই জবাবের কাগজপত্র তিনি দিতে চাননি।

জানতে চাইলে স্পাইডার গ্রুপের ডিএমডি মো. রোকনউদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, বিজিএমইএ’র পাঠানো চিঠিতে কিছু ভুল তথ্য ছিলো। আমরা তার জবাব দিয়েছি। আমরা তাদের সঙ্গে একাধিক মিটিং করে বিষয়টি সমাধান করে ফেলেছি। এখন তাদের আর কোনো আপত্তি নেই। কী ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তার লিখিত কাগজ চাওয়া হলে তিনি বলেন, কোনো কাগজ নেই। আমরা বিজিএমইএ ভবনে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে বিষয়টি ওখানেই শেষ করে এসেছি। কোনো লিখিত চিঠি দিতে হয়নি।

জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের গোয়েন্দা সেলের প্রধান মোহাম্মদ আব্দুর রকিব মানবজমিনকে বলেন, এমন অসংখ্য ঘটনা আছে। তবে কাগজপত্রসহ কোনো অভিযোগ আসলে আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে পারি। আর তদন্তে যদি শুল্ক ফাঁকির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় তখন ব্যবস্থা নেয়া হবে।