Image description

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় সুপেয় পানির অভাব এখন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে মাটির অগভীর স্তরে বিষাক্ত আর্সেনিক, অন্যদিকে বিকল্প হিসেবে বসানো অতিগভীর নলকূপে অত্যধিক লবণাক্ততা; এই দুই সংকটের যাঁতাকলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার বাসিন্দা। রান্নার পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে গোসল কিংবা মুখ ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজেও এখন সাধারণ মানুষকে রীতিমতো জীবনযুদ্ধ করতে হচ্ছে।

পৌরসভার রাজারামপুর, চান্দলাই ও রেহাইচর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মানুষের কষ্টের চিত্র। রাজরামপুর এলাকার বাসিন্দা সারোয়ার জাহান বলেন, এই পানি দিয়া মুখ পর্যন্ত ধুইতে গেলে কষ্ট হয়। খুবই নুনতা। ঘরের কাজে এই পানি ব্যবহার করলে হাতে ফোসকা পড়ে; চুলকানি হয়।

একই এলাকার বাসিন্দা সেরাজুল ইসলাম জানান, নলকূপ ছাড়লে পানি বের হয় অত্যন্ত গরম এবং লোনা। এই পানি দিয়ে গোসল করলে শরীরে অস্বস্তি ও চর্মরোগ দেখা দেয়। নিরাপদ উৎসের অভাবে নিরুপায় হয়ে মানুষ এখন বিভিন্ন অনিরাপদ উৎসের পানির দিকে ঝুঁকছে।

ব্যর্থ হয়েছে অতিগভীর নলকূপ প্রকল্প: ২০২০ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকার সহায়তায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার রাজারামপুর, চান্দলাই এবং রেহাইচর এলাকায় ৩টি অতিগভীর (প্রায় ১ হাজার ফুট) নলকূপ স্থাপন করা হয়। মূলত আর্সেনিকমুক্ত স্তরের সন্ধানে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা নতুন সংকট তৈরি করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্যমতে, বাংলাদেশের মানদণ্ডে প্রতি লিটার পানিতে ক্লোরাইডের মাত্রা ১৫০-৬০০ মিলিগ্রাম থাকার কথা থাকলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরএলাকার রাজারামপুর এলাকার অতিগভীর নলকূপে (৯৬৫ ফুট) পাওয়া পানিতে ক্লোরাইডের মাত্রা ছিল ১ হাজার ২৮০ মিলিগ্রাম, টিডিএসের মাত্রা ছিল ২ হাজার ৫৭০ মিলিগ্রাম, চান্দলাই এলাকায় অতিগভীর নলকূপে (১ হাজার ফুট) ক্লোরাইডের মাত্রা ছিল ৮৩০ মিলিগ্রাম, টিডিএস ১ হাজার ৭১০ মিলিগ্রাম, রেহাইচর এলাকায় (১ হাজার ৯ ফুট) ক্লোরাইডের মাত্রা ৮৩০ মিলিগ্রাম,

টিডিএসের মাত্রা পাওয়া যায় ১ হাজার ৭৮০ মিলিগ্রাম। এসব নলকূপে আর্সেনিকমুক্ত পানি পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে তা পানযোগ্য নয়। তবে ২০২১ সালে পৌরসভার বাইরে জেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত একই ধরনের পাঁচটি নলকূপে লবণাক্ততা ও টিডিএসের মাত্রা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাটি নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক। লবণাক্ততার পাশাপাশি পৌরসভার বিভিন্ন স্থানের গভীর জলাধারের পানিতে উচ্চমাত্রার আর্সেনিক পাওয়া গেছে।

এই অদ্ভুত পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সরওয়ার জাহান। তিনি জানান, আজ থেকে কোটি বছর আগে এই অঞ্চলটি সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি ছিল। সময়ের বিবর্তনে সমুদ্র সরে গেলেও মাটির গভীর স্তরে লবণের আস্তর রয়ে গেছে। এখন গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেই স্তরের পানিই উঠে আসছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অন্যদিকে অগভীর স্তরের পানিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার আর্সেনিক। ফলে ওপরের স্তরে বিষ আর নিচের স্তরে লবণ-এই দুইয়ের মাঝে আটকা পড়েছেন পৌরবাসী।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার ১, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু অংশ ছাড়া বাকি অধিকাংশ এলাকার পানিতে লোহা ও আর্সেনিকের সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে বিকল্প পানির কোনো উৎস না থাকায় বাধ্য হয়েই ৮ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষকে অতিগভীর নলকূপের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, লোনা পানি পরিশোধন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই পৌরসভা বর্তমানে নদীর পানি পরিশোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহের একটি বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার সরকার জানান, সমস্যাটি মূলত নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ। পৌরসভার বাইরে অন্য স্থানে পরীক্ষামূলক নলকূপে পানির মান স্বাভাবিক পাওয়া গেছে। এই সংকট সমাধানে তারা বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।