লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের একটি কলাম ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘আমরা আর কতকাল মিসকিন থাকব’ শিরোনামের ওই লেখায় বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) পরিচয়, এর সুবিধা–অসুবিধা এবং রাজনীতিবিদদের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
কলামটি ঘিরে পাঠক, বিশ্লেষক ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
কলামের শুরুতে লেখক এলডিসি শব্দটির দ্বৈত অর্থ তুলে ধরেন—একদিকে অফিস-আদালতের ‘লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক’, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’। তার মতে, ‘স্বল্পোন্নত’ শব্দটি ব্যবহারের মধ্যে এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা বা মানসিক সান্ত্বনা কাজ করে। বাস্তবে এটি উন্নয়নের নিম্নতম স্তরের নির্দেশক হলেও ভাষাগতভাবে সেটিকে কিছুটা নমনীয় করে উপস্থাপন করা হয়।
তিনি লেখেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) হিসেবে পরিচিত। বলা যেতে পারে ‘কুখ্যাত’। এই স্তরের দেশগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সবার নিচে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী রাশেদ মাহমুদ লিখেছেন, “শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, তবে ‘স্বল্পোন্নত’ বললে উন্নয়নের সম্ভাবনাও বোঝায়—এটা পুরোপুরি নেতিবাচক নয়।” অন্যদিকে নাসরিন জাহান নামের এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “আমরা অনেক সময় বাস্তবতা আড়াল করতে শব্দের আশ্রয় নিই—এ কথাটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, দেশগুলোকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়—স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত। এই শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ এবং এর অধীনস্থ কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে এলডিসি নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এই সূচকগুলোতে অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। এই অর্জনকে অনেকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দেখছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, “বাংলাদেশের উত্তরণ একটি বড় অর্জন। তবে উত্তরণের পর যে চ্যালেঞ্জ আসবে—বিশেষ করে বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতায়—তা মোকাবিলার প্রস্তুতি জরুরি।”
কলামে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশ নিজেই এলডিসি তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতির প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লেখক এখানে একটি বিতর্কিত তুলনা টানেন—ভিয়েতনামের সঙ্গে, যা একই সময়ে দরিদ্র হলেও এলডিসি তালিকায় যায়নি।
এই তুলনা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, “ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ আলাদা ছিল। সরাসরি তুলনা করলে বাস্তবতার অনেক পার্থক্য উপেক্ষিত হয়।”
লেখক প্রশাসনিক ব্যয় ও বিলাসিতার উদাহরণ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন—একদিকে এলডিসি পরিচয় ধরে রেখে সুবিধা নেওয়া, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অপচয় কি যৌক্তিক? সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরিফুল ইসলাম লিখেছেন, “অপচয় কমানো গেলে এলডিসি সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমবে।” তবে অন্য এক ব্যবহারকারী শারমিন আক্তার বলেন, “সব ব্যয়কে অপচয় বলা ঠিক নয়—অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা থাকে।”
কলামে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য উল্লেখ করে লেখক বলেন, এলডিসিকে উন্নয়নের ধাপ হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার মতে, এলডিসি মূলত একটি নিম্নস্তরের পরিচয়, উন্নয়নের স্বীকৃতি নয়।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক সময় সরলীকৃত হয় এবং সাধারণ জনগণের কাছে সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য এমন ভাষা ব্যবহার করা হতে পারে।
লেখক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন এলডিসি সুবিধাগুলো—সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা, ওষুধে রয়্যালটি ছাড় ইত্যাদি। যেমন বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক–এর ঋণে কম সুদ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা পাওয়া যায়।
এই সুবিধাগুলো বাংলাদেশের শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা কমে যাবে—এ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ রয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন—যদি ভিয়েতনাম প্রতিযোগিতা করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?
ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেন, “আমাদের প্রস্তুতি আছে, কিন্তু সময় দরকার। হঠাৎ সুবিধা হারালে চাপ বাড়বে।”
বর্তমানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৪৬টি এলডিসি। এর মধ্যে বেশিরভাগ আফ্রিকায়, কিছু এশিয়ায় এবং একমাত্র আরব দেশ ইয়েমেন। অনেক ছোট দ্বীপরাষ্ট্র পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে এখনও এলডিসি তালিকায় রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সূচকগুলোতে উন্নতি হওয়ায় উত্তরণের পথ সুগম হয়েছে।
মহিউদ্দিন আহমদের লেখাটি তীক্ষ্ণ ও প্রশ্নবোধক হলেও এতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন—
তুলনার সরলীকরণ: ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করা হলেও দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের বিশ্লেষণ কম: উন্নয়ন সত্ত্বেও আয়ের বৈষম্য, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা নেই।
নীতিগত জটিলতা উপেক্ষা: এলডিসি থেকে উত্তরণ শুধু মানসিকতার বিষয় নয়; এটি জটিল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তথ্যসূত্রের ঘাটতি: কিছু দাবির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা গবেষণালব্ধ তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
নেটিজেন তানভীর হাসান বলেন, “লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, কিন্তু নীতিগত সমাধানের দিকটি আরও বিশ্লেষণ করা যেত।” দেশের এলডিসি পরিচয় দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলেও এখন দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। উত্তরণ একদিকে যেমন সাফল্যের প্রতীক, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা।
মহিউদ্দিন আহমদের কলাম সেই বাস্তবতাকে সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি এখনও ‘সুবিধাভোগী মানসিকতা’ থেকে বের হতে প্রস্তুত?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতিতে নয়, বরং নীতি, প্রশাসন ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের মধ্যেই নিহিত—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।