সাভারে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবার যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন উপযুক্ত চিকিৎসা এবং ন্যায্য বিচার পাননি। হতাহতদের পুঁজি করে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠন তাদের অনুদানের অর্থ ‘নয়ছয়’ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন আহত শ্রমিকরা।
এমন অভিযোগ করেছেন রানা প্লাজায় আহত শ্রমিক মাসুদা আক্তার। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সকালে কাজ করছিলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ গেলো। এরপর জেনারেটর চালু করতেই বিকট শব্দ। তারপর আর কিছু জানি না, যখন জ্ঞান ফিরলো তখন হাসপাতালের বিছানায়। পেটের এক পাশ দিয়ে রড ঢুকে গিয়েছিল। কোমরের হাড়, মেরুদণ্ড, ফুসফুসে আঘাত লেগেছিল।’
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘১৩ বছর হয়ে গেলো। না পাইলাম পুনর্বাসন, না পাইলাম বিচার, বরঞ্চ আমাদের ব্যবহার করে অনেকে এখন বড়লোক। আমরা কিছুই পাইলাম না।’
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার নথিপত্রের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৫ জন নিহত হন। অঙ্গহানিসহ বিভিন্ন ধরনের আহত হন অন্তত ২ হাজার ৫০০ শ্রমিক।
মাসুদা আক্তার সেদিন ভবনটির সাততলায় নিও টেক্স লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ওই ঘটনার ১৩তম বছরে এসেও পুনর্বাসন, বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ এই শ্রমিকের। এ ছাড়াও তার ক্ষোভ রানা প্লাজার ঘটনাকে পুঁজি করে সুবিধা গ্রহণ করা বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের বিরুদ্ধেও। তবে শুধু মাসুদা আক্তার একাই নন, একই রকম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আরও অনেকে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পরপরই হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, সহযোগিতায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ জানায় ট্রেড ইউনিয়ন ভুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। এ ছাড়া বিদেশি বিভিন্ন সহযোগিতা এনে দিতে ভূমিকা রাখে বিভিন্ন এনজিও।
শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, ট্রেড ইউনিয়ন তথা শ্রমিক সংগঠন কোনও অর্থনৈতিক সংগঠন নয়। তহবিল সংগ্রহেরও কোনও সুযোগ নেই। এসব সংগঠন পরিচালিত হয় শ্রমিকদের দেওয়া অর্থে।
শহীদ বেদি এখন ‘প্রতিবাদের প্রতীক’
শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রানা প্লাজায় হতাহত শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছিল ‘রানা প্লাজা ক্লেইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ কমিটির মাধ্যমে। এতে সরকার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, এনজিওসহ বিভিন্ন পক্ষ যুক্ত ছিল। ক্ষতিপূরণ বণ্টনের ক্ষেত্রে রানা প্লাজা ক্লেইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিটি একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করেছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মেডিক্যাল অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত। সেই অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। যেমন- যেসব শ্রমিকের অঙ্গহানি হয়েছে (হাত বা পা হারিয়েছেন) তাদের ক্ষেত্রে এককালীন নগদ অর্থ না দিয়ে ব্যাংকে এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট) করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা মাসে মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পায় বা চিকিৎসা সহায়তা পান। এই এফডিআরের পরিমাণ সাধারণত ১০ লাখ থেকে ১৪ লাখ টাকার মধ্যে ছিল, যা ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে, নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য আলাদা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ছিল, যা তাদের বেতন অনুযায়ী তাদের ওপর নির্ভরশীলদের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির কার্যক্রম নিয়ে কোনও ধরনের আপত্তি পাওয়া যায়নি।
তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো নিয়ে নানা সময় অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালে অভিযোগ ওঠে রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে চ্যারিটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলেও সেই টাকা আহত শ্রমিকদের না দিয়ে আয়োজক সংগঠনগুলো আত্মসাৎ করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘লাভ দেশ’-এর সিইও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ইয়াসমিন চৌধুরী হ্যাপী ওই অভিযোগে আওয়াজ ফাউন্ডেশন, ফ্যাশন রেভোলেশন-ইউকে এবং ফেয়ার ওয়ার ফাউন্ডেশন নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাও করেন।
সেসময় সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাকারিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘লন্ডনে কয়েকটি প্রোগ্রামে রানা প্লাজায় আহত মরিয়মের নিখোঁজ বোন শ্যামলীর ছবি ব্যবহার করে তিনটি সংস্থা প্রায় ২৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। সুইজারল্যান্ডের লাউডিস ফাউন্ডেশনের লেসলে জন্সটন এবং আমেরিকান সংস্থা রেড কার্পেট গ্রিন ড্রেসের কাছ থেকে এসব সহায়তা নেয় আওয়াজ ফাউন্ডেশন।’
শ্রমিকরা বলছেন, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন, সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির মতো সংগঠনগুলোও এসব অর্থ নয়ছয়ের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। তারা বলছেন, শ্রমিকদের জন্য সহায়তা বা অন্যান্য সহযোগিতার নামে অর্থ আনা হলেও বাস্তবে তারা সীমিত সহায়তা পেয়েছে- কখনও খাদ্যসামগ্রী, কিন্তু প্রত্যাশিত সহায়তা নয়।
রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় প্যান্টম টেক্স লিমিটেডে কাজ করতেন পারুল বেগম। দুর্ঘটনায় তার শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার দিন আমার বাম পাশ দিয়ে রড ঢুকে গিয়েছিল। এতে আমার ডান পাশে কিডনির সমস্যা হয়, ২০১৯ সালে অপারেশন করিয়েছি। কিন্তু এখনও সুস্থ হইনি। এখনও প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। বর্তমানে সরকারের ফান্ড থেকে চিকিৎসা সহায়তা পাচ্ছি।’
বেসরকারি সংস্থা থেকে সহায়তা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সামান্য সহযোগিতা পাইছি। কিন্তু সংগঠনগুলো ডাইকা নিয়ে শুধু কথা বলায়। আমাদের তেমন লাভ হয় না। এখন আর কোনও সহায়তা করে না। আওয়াজ ফাউন্ডেশন কোটি কোটি টাকা ইনকাম করছে আমাদের নাম দিয়ে। কিন্তু আমি পাইছি মাত্র ছয় হাজার টাকা, দুই বছরে। তাও যাকাত হিসেবে। আর কোনও সহায়তা পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনসহ আরও অনেক সংগঠন বিদেশ থেকে টাকা আনে। কিন্তু আমাদের কাছে সেই টাকা আসে না। ৫০০, এক হাজার, দুই হাজার টাকা দিয়ে দায় সারছে। সব সংগঠনই আমাদের নাম ভাঙিয়ে খাইতেছে। কেউ বেশি, কেউ কম, এটা তারা ভালো জানে। আমাদের তো কিছু দেয় না। সরকারের কাছে দাবি, এসব সংগঠনের দায়িত্বশীলদের তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
রানা প্লাজার সাত তলায় নিও টেক্স লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন মাসুদা আক্তার। সেদিনের স্মৃতি এখনও স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমার একটা হাড় ভাঙছে। তিনটা হাড় বেঁকাইছে। মাথায় আঘাত পাইছি, রক্ত জমে গেছিল।’
দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য কোনও সহায়তা পাননি বলে দাবি তার। ‘আজ পর্যন্ত আমরা দৌড়াদৌড়ি করছি, কিন্তু কোনও ফল পাই নাই’ বলেন তিনি।
বিভিন্ন সংগঠন ও এনজিওর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাসুদা। তার অভিযোগ, ‘আমাদের দেখাইয়া সাহায্য নেওয়া হইছে। মানুষরে দেখাইয়া হেরা টাকা আনছে, কিন্তু আমাদের কিছুই দেয় নাই।’
তিনি আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘নাজমা (আওয়াজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক) লন্ডন থেকে ৩০ কোটি টাকা আনছে। আমাদের কাছে ডকুমেন্টস আছে। আমাদের নিয়া মিছিল, মিটিং করাইছে, সাংবাদিকদের সামনে নিয়া গেছে। কিন্তু শেষে ৫০০ টাকা দিছে, ভাড়া-খরচ দিছে, এই পর্যন্তই।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘বিদেশে রানা প্লাজা স্মরণে অনুষ্ঠান করে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, সেটিও শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায় না। ওই টাকাগুলা আত্মসাৎ করছে সংগঠনগুলো।’
অধরচন্দ্রের মাঠ এখনও বয়ে বেড়ায় সেই স্মৃতি
‘মিনা বাংলাদেশ’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন তিনি। এই শ্রমিক বলেন, ‘কোরিয়ান সহায়তায় একটি কাজের সুযোগ তৈরি হলেও পরবর্তীতে সেটি আর টেকেনি। এক কোটি টাকা লোন আনছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের দেখাইয়া যারা টাকা আনছে, আমরা চাই তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্ত চান সংশ্লিষ্টরাও
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গেও। যদিও আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তারের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। এরপর তিনি আর পরবর্তীতে কল রিসিভ করেননি।
বিভিন্ন এনজিও ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের কিছু কথা শুনেছি। তবে আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই। তাই শুধুমাত্র শোনা কথার ভিত্তিতে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন। যেখানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি আমি। এ ছাড়া প্রয়াত বাবু রায়ের চন্দ্রের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স, ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং নির্বাহী সম্পাদক সুলতানউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’
আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই চারটি সংগঠন বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেনি। তবে এর বাইরে কেউ যদি রানা প্লাজার নামে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক বাবুল আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রানা প্লাজার শ্রমিকরা মূলত আইনগত যে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য ছিল, তা পায়নি; বরং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন দাতা ও সংস্থার অনুদান ও সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আইনে যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত ছিল, সেই অনুযায়ী কেউই পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেয়নি। যা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত অনুদান ও সহায়তা।’
তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে। পরবর্তীতে একটি রানা প্লাজা অ্যারেঞ্জমেন্ট ফান্ড গঠন করা হয়। যেখানে সরকার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ (আইএলও) বিভিন্ন পক্ষ যুক্ত ছিল। এই তহবিল থেকেই শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়েছে, যেখানে কোনও মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না।”
তবে ফান্ডের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে কোথাও অর্থ সংগ্রহ হয়ে থাকলে সে বিষয়ে জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বাবুল আক্তার বলেন, ‘নিহতদের পরিবারের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার কথা ছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। আহতদের জন্য আজীবন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে আহতদের পুনর্বাসন, আবাসন ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি এখনও প্রাসঙ্গিক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আহতদের তালিকায় কিছু অনিয়মও দেখা গেছে, যেখানে প্রকৃত শ্রমিক ছাড়াও কিছু অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তি সুবিধা দাবি করেছেন।’
অর্থ স্বচ্ছভাবে বণ্টনের দাবি শ্রমিকনেতাদের
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রমিকদের নামে আনা আর্থিক সহায়তা সঠিকভাবে ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছায়নি। এমন অভিযোগ নতুন নয়। এ বিষয়ে অতীতে একটি আন্তর্জাতিক মামলাও হয়েছিল। লন্ডনের এক নারী এই অভিযোগে মামলা করেছিলেন এবং সুইডেনভিত্তিক কয়েকটি এনজিওর বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই মামলার তেমন অগ্রগতি হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন এনজিও বিদেশ থেকে সহায়তা এনেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সহায়তার পুরোটা শ্রমিকরা পাননি। অনেক ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো নামমাত্র সহায়তা দিয়ে বাকি অর্থের স্বচ্ছ হিসাব দেয়নি। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত চাই। বাইরে থেকে যে অর্থ এসেছে, তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছেছে কিনা, এটি খতিয়ে দেখা জরুরি। যেসব সংগঠনের নামে এ ধরনের অভিযোগে উঠে আসছে, সেগুলোও তদন্তের আওতায় এনে সত্যতা যাচাই করা উচিত। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আলাদা তহবিল গঠন করে সেই অর্থ স্বচ্ছভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করাও জরুরি।’
একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রমিকদের নামে অর্থ আনা হলেও সেটি যথাযথভাবে পৌঁছেছে কিনা, এই অভিযোগ নতুন নয়। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিতে গিয়েও এমন অভিযোগ শুনেছি। তবে বাস্তবে এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠন রানা প্লাজা ইস্যুতে সহায়তার কথা বললেও বাস্তবে কী পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামান্য সহায়তা, যেমন খাদ্যসামগ্রী বা স্বল্প অর্থ, দিয়ে ছবি তুলে প্রচার করা হয়। কিন্তু দাতারা প্রকৃতপক্ষে জানেন না, ভুক্তভোগীরা আসলে কী পরিমাণ সহায়তা পেয়েছেন। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব থাকতে পারে। শ্রমিকদের কাছ থেকে এমন অভিযোগও এসেছে যে চিকিৎসা খরচ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল তৈরি করা হয়েছে, কিংবা অল্প অর্থ দিয়ে বেশি টাকার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা কঠিন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট দাবি রয়েছে, কোথা থেকে কত টাকা সংগ্রহ করেছে এবং কীভাবে ব্যয় করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিজিএমইএ, সরকার, বিভিন্ন এনজিও এবং শ্রমিক সংগঠন, যারা এ ঘটনায় কাজ করেছে, সবারই উচিত তাদের আয়-ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করা। যারা রানা প্লাজা নিয়ে কাজ করেছে, তারা যদি স্বচ্ছভাবে বলে, কোথা থেকে কত টাকা এসেছে এবং কাকে কত দেওয়া হয়েছে, তাহলে সব অভিযোগের সহজেই নিষ্পত্তি হবে।’
খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি মূলত সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতির প্রতিফলন। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলেও বড় বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কার্যকর বিচার নিশ্চিত হয়নি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় এখনও দৃশ্যমান বিচার না হওয়া এটিই প্রমাণ করে, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। বিভিন্ন সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা রানা প্লাজার শ্রমিকদের নামে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেও সেই অর্থ যথাযথভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছায়নি। এসব অভিযোগ অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনা উচিত।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, কার কাছ থেকে কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেই অর্থ কাদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন করা হয়েছে, তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের অনিয়ম চলতে পারে এবং শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হতে পারেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এত বড় একটা ঘটনা ছিল। এত মানুষ ওই খানে যুক্ত ছিল, কে কোত্থেকে কী পাইছে এবং কী খরচ করছে এটা তো জানার কোনও উপায় নাই। যারা দাবি করে তারাও কতখানি সঠিক সেটা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে।’
এ ব্যাপারে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিকে ঘিরে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগগুলো শোনা যাচ্ছে, সেগুলোর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা নিশ্চিত ভিত্তি তার কাছে জানা নেই। অনেকে মুখে মুখে নানা কথা বলছে। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারার বা বিজিএমইএর আনুষ্ঠানিক কোনও চ্যানেলের মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। তাই এগুলো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ ধরনের বিষয় সাধারণত সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা পক্ষগুলোর মাধ্যমেই যাচাই হওয়া উচিত। নির্দিষ্ট প্রমাণ বা স্পষ্ট অভিযোগ ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন।’
প্রসঙ্গত, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সাহায্য, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে দেশি-বিদেশি অনেক সংগঠন কাজ করে আসছে। এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো। গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি: ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় থাকে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ): বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের এই মোর্চা নীতি নির্ধারণী বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করে। ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিল: বৈশ্বিক জোট ইন্ডাস্ট্রি অল-এর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করে। ব্লাস্ট (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট): ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সহায়তা প্রদান করে। রানা প্লাজা সারভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন: এই সংগঠনের সদস্যরা নিজেরাই ট্র্যাজেডির শিকার এবং তারা অন্যদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র: দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবিতে লড়াই করে।
ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রেখেছে: আইএলও: রানা প্লাজা অ্যারেঞ্জমেন্ট-এর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করেছে। ইন্ডাস্ট্রি অল ও ইউনি গ্লোবাল ইউনিয়ন: ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদী আয়ের উৎস খুঁজে দিতে সহায়তা করে। ক্লিন ক্লদস ক্যাম্পেইন: ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার আদায়ে এবং ব্র্যান্ডগুলোকে চাপে রাখতে আন্তর্জাতিকভাবে সরব থাকে। জিআইজেড: জার্মানির এই সংস্থাটি শ্রমিকদের জন্য পাইলট স্কিম ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল: পঙ্গু হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও বিশেষায়িত চিকিৎসায় কাজ করেছে।
