রাজধানীর গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে গত বছর থেকে এ পর্যন্ত অনেক জলঘোলা হয়েছে। বাংলা সন অনুযায়ী বছরের শুরুতে হওয়া এই ইজারায় প্রথম দফায় সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান ২২ কোটি টাকা দর দিলেও প্রক্রিয়াগত ভুলের অজুহাতে সেটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
দ্বিতীয় দফার ইজারায় ২৫ কোটি টাকার সর্বোচ্চ দরদাতা টি এইচ এন্টারপ্রাইজ শেষ মুহূর্তে প্রস্তাবিত অর্থ পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করে। এ সময় ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে হাটের ইজারা দেওয়া হয়। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সঙ্গে মোহাম্মদ এজাজের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছিল। ইজারার এসব অভিযোগ সামনে এলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) করপোরেশন ও হাটে অভিযান চালিয়ে ইজারায় অনিয়মের প্রমাণ পায়।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির এই অভিযোগের অনুসন্ধান চলাকালে ডিএনসিসির সাবেক এই প্রশাসককে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। তবে গাবতলীর পশুর হাটের এই ইজারার প্রায় এক বছর পর ইজারা ঘিরে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে এসেছে।
সে সময় দ্বিতীয় দফার ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা টি এইচ এন্টারপ্রাইজ শেষ মুহূর্তে প্রস্তাবিত অর্থ পরিশোধ না করায় তাদের পে-অর্ডারের সাড়ে ৭ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএনসিসি। তবে চলতি বছরের ইজারা প্রক্রিয়ার পর জানা গেছে, টি এইচ এন্টারপ্রাইজের পে-অর্ডারের টাকা বাজেয়াপ্তের পরও তারা সে সপ্তাহেই এই টাকা উত্তোলন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি সাভার হেমায়তপুরের এসবিএসি ব্যাংক পিএলসি থেকে পে-অর্ডারের টাকা উত্তোলন করেছিল। এতে প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও।
ডিএনসিসির সচিব ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জামানতের টাকা উত্তোলনের জন্য মেয়র বা প্রশাসকের অনুমোদনের পরে সচিব এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু জামানতের টাকা উত্তোলনে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়নি। আমি এতে কোনো ধরনের স্বাক্ষর করিনি। এখন কাগজপত্র ঘেঁটে দেখতে হবে, কীভাবে সেটি উত্তোলন হলো।’
এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান হিসাবরক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের পরও কীভাবে সেটি উত্তোলন করা হয়েছে, তা তাদের জানা নেই। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে দুদকে তলব করা হয়। দুদকে জমা দেওয়া লিখিত জবাবে তিনি এই জামানতের টাকা করপোরেশন বাজেয়াপ্ত করেছিল বলে জানিয়েছিলেন।’
এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘ঘটনাটি তার জানা ছিল না। এমনটি ঘটে থাকলে এর সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নথিপত্র অনুযায়ী জানা যায়, গাবতলীর পশুর হাটের সরকার নির্ধারিত দর ১৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। হাট ইজারা দিতে গত বছরের ৩ মার্চ প্রথম দফায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তখন সর্বোচ্চ দর পাওয়া যায় সোয়া ২২ কোটি টাকা। এ দর দিয়েছিল মেসার্স আরাত মোটরের স্বত্বাধিকারী আরাত হানিফ। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সর্বোচ্চ দরদাতা আরাত মোটরকে ইজারা দিতে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দরপত্র বাতিল করে তখন খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন।
প্রথম দফায় গাবতলী হাটের দরপত্র সিপিটিইউতে (আগে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট, বর্তমান বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি-বিপিপিএ) প্রকাশ করা হয়নি, এমন কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়েছিল। যদিও দেশের কোনো হাটবাজারের ইজারার বিজ্ঞপ্তি সিপিটিইউর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না, সে সুযোগও নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তখন ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেছিলেন, প্রশাসকের পছন্দের ব্যক্তি সর্বোচ্চ দরদাতা হতে না পারায় দরপত্র আহ্বানে প্রক্রিয়াগত ভুল দেখিয়ে ইজারার পরিবর্তে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
গত ২২ মে দ্বিতীয় দফায় গাবতলী হাটের জন্য ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। দরপত্র খোলা হয় গত ২৮ এপ্রিল বিকেলে। এ দফায় হাটের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকার দর প্রস্তাব পাওয়া যায়। দরটি দেয় টিএইচ এন্টারপ্রাইজ। মালিক আলী হায়দার।
জমা দেওয়া চারটি দরপত্রের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার প্রস্তাব আসে এরফান ট্রেডার্সের কাছ থেকে। এর মালিক দারুস সালাম থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক ওরফে সাজু।
সংস্থাটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিএনপির এই নেতা ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের পছন্দের ব্যক্তি। শেষ পর্যন্ত গাবতলী হাটের ইজারা সাজুকেই দেয় ডিএনসিসি।
করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, গত বছর গাবতলী স্থায়ী পশুর হাটের এই ইজারায় ডিএনসিসির ৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। যদিও এক মাসের বেশি সময় (১৫ এপ্রিল থেকে ১৮ মে পর্যন্ত) খাস আদায় করে ডিএনসিসি এই হাট থেকে ৯৮ লাখ ৪ হাজার টাকা আদায় করে।
নিজেদের আদায় করা এই টাকা যোগ করলেও গাবতলী হাটে সংস্থাটির আর্থিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি। সে সময় এতে শুধু যে ডিএনসিসির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা নয়। কম টাকায় ইজারা দেওয়ায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে সরকারেরও।
প্রথম দফায় সোয়া ২২ কোটি টাকায় হাটের ইজারা দিলে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর (আইটি) বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় হতো ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতার কাছ থেকে ভ্যাট ও আইটি বাবদ সরকার পাচ্ছে ৩ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা ১ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা কম।
এদিকে গাবতলী হাট ও ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, প্রথম দফার দরপত্র বাতিলের পরে দ্বিতীয় দফা দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত গাবতলী হাটের খাস আদায় করছিলেন রাইয়ান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলামের লোকজন। সাইদুল দারুস সালাম থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক ওরফে সাজুর ঘনিষ্ঠ বলে জানান দলটির স্থানীয় নেতারা।
এসব বিষয়ে ডিএনসিসির সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।