Image description

ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক-এর মতো প্ল্যাটফর্মে মুহূর্তের মধ্যেই যেকোনো তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সহজে। তবে এই দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গুজব, অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার, যা সমাজে ভয়াবহ অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার ও গুজবের কারণে ‘মব’ তৈরি হওয়া এবং এর ফলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশে একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি সারাদেশে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ‘মব জাস্টিস’-এর পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব, ভুয়া তথ্য ও উসকানিকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাতের এক বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে সহিংসতায় রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে ডাকসুর কেন্দ্রীয় তিন নেতা এবি জুবায়ের, মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী এবং দায়িত্ব পালনরত একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলা চালায় ছাত্রদলের কর্মীরা।

পরবর্তীতে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) ও রিউমার স্ক্যানারসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার যাচাইয়ে উঠে আসে যে, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ এডিটেড ও ভুয়া। তদন্তে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে ডাকসুর কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা।

ঘটনার সত্যতা অনুধাবন করে ডাকসুর নেতারা বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করতে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় ছাত্রদলের শতাধিক কর্মী থানার ভেতরে প্রবেশ করে এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই ডাকসুর নেতা, শিবিরের কর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।

রাতেই আহতদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের খোঁজখবর নেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ মুহাম্মদ শিবলী।

ঘটনাটি ইতোমধ্যে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহল এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

এর আগে গত ১১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং কুরআন মাজিদ অবমাননার অভিযোগ তুলে স্থানীয় জনতা একটি দরবারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে (৫৫) পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। 

জানা গেছে, এই বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই গ্রামের সহজ-সরল স্থানীয় মানুষ ‘মব’-এ অংশগ্রহণ করে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গুজবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আবেগনির্ভরতা। মানুষ যখন ভয়, রাগ বা চমকের মতো অনুভূতির সঙ্গে কোনো তথ্য পায়, তখন তা যাচাই না করেই দ্রুত শেয়ার করে। ইউনেস্কোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন গুজব গণবিশ্বাসকে দুর্বল করে এবং সমাজে নানা বিভক্তি তৈরি করে। ফলে একটি মিথ্যা তথ্যও কখনো কখনো বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

গুজবের কুফল বহুমাত্রিক এবং তা ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। সামাজিকভাবে এটি উত্তেজনা ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে, যেখানে নিরীহ মানুষ হয়রানি বা হামলার শিকার হন। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই মানহানি, অপপ্রচার কিংবা মানসিক চাপে পড়েন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে; গুজবের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান বা পণ্যের ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

ইউনিসেফের মতে, শিশু ও কিশোররা অনলাইন গুজবের কারণে মানসিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গুজব দ্রুত ছড়ানোর পেছনে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণ কাজ করে। প্রথমত, মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের প্রবণতা কম। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়ায় যা বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, ফলে চমকপ্রদ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। তৃতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব অনেক মানুষকে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করতে বাধাগ্রস্ত করে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং যেকোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে এএফপি ফ্যাক্ট চেক বা স্নোপস-এর মতো ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লিটারেসি বা মিডিয়া শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো দরকার, যাতে নতুন প্রজন্ম তথ্য যাচাইয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া সুলতানা সংবাদমাধ্যম আরটিএনএনকে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে গুজব শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করছে না, অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান সব পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠলেও এর অপব্যবহার সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। গুজব প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই ডিজিটাল সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। একই সঙ্গে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। গুজব ছড়ানোকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকেও ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও অপসারণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তিনি জানান।

সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, চরিত্রহনন ও ভুয়া তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি প্রধান) জনাব মো. শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যম আরটিএনএনকে বলেন, ‘আমরা সাধারণত কারও বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করি না। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে কেউ যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, অপপ্রচার, চরিত্রহনন ও ভুয়া তথ্য ছড়ায় এবং নানা ধরনের সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তবে অবশ্যই আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

ডিবি প্রধান আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন গুজব, ভুয়া তথ্য ও নানা অনলাইন অপরাধ তৎপরতা রোধে ডিবির বিশেষ টিম নিয়মিত মনিটরিং করে যাচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, ভুয়া তথ্য ও সাইবার ক্রাইম রোধে সিআইডির উদ্যোগ ও পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. জসিম উদ্দিন খান সংবাদমাধ্যম আরটিএনএনকে বলেন, ‘সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার স্পেসে বিভিন্ন অপরাধী ও প্রতারকরা নিত্যনতুন যে কৌশল ও টুলস নিয়ে আসছে, সেটির সাথে প্রশাসন, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতি মুহূর্তে আপডেট থাকতে হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাইবার স্পেসের ক্রাইম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। অত্যাধুনিক টুলস-ডিভাইসের অভাব, পর্যাপ্ত জনবলের (ম্যানপাওয়ার) অনুপস্থিতি ও উন্নত মানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা না থাকার কারণে সাইবার স্পেসে অপরাধ রোধে পুলিশকে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে।’

আরটিএনএন