বুধবার এক অভূতপূর্ব সংসদ অধিবেশন দেখল পুরো জাতি। জ্বালানি সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এ ইস্যুতে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ কয়েকজন মন্ত্রীর ইতিবাচক বক্তব্য দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেছে। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের এমন সৌহার্দপূর্ণ, সহনশীল ও দেশপ্রেমের বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। বাংলা ভাষাভাষী কোটি কোটি মানুষ তাদের বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হন। টক শো ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এমন বক্তব্যের বেশ প্রশংসা করতে শোনা যায়। সবাই বলছিলেন, সংসদে সত্যিকারার্থে এমন গণতন্ত্রের চর্চা ও জাতীয় ঐক্য দেখার জন্য মানুষ বহুকাল ধরে অপেক্ষা করে আসছিল। বিশেষ করে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নতুন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা ছিল, সেখানে সরকার ও বিরোধী দলকে সবাই এভাবেই দেখতে চেয়েছে। এ বিষয়ে যুগান্তরের কাছে কয়েকজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকও এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
জ্বালানি সংকটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে বিরোধী দলের প্রস্তাব সাদরে সরকারি দলের গ্রহণ করাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক অগ্রগতি বলে তারা মন্তব্য করেন। তারা বলেন, আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি হচ্ছে, যে কোনো ইস্যুতে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা। দেশে সংকট বা সমস্যা দেখা দিলে তা আরও প্রকট করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। দেশের মানুষের কষ্ট কমিয়ে আনতে সরকার ও বিরোধী দলের একসঙ্গে কাজ করার উল্লেখযোগ্য নজির খুব কম। অনন্ত নিকট-অতীতে এমন কোনো উদাহরণ নেই। তারা আরও বলেন, এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই বুধবার জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের কমিটি গঠনের প্রস্তাব এবং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান তা মেনে নিয়ে কমিটি গঠন করে দেওয়া রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। দেশের স্বার্থে এমন ধারা অব্যাহত রাখার ওপর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সংস্কারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সরকার ও বিরোধী দল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে এভাবে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছাতে পারেন বলে তারা পরামর্শ দেন। বিশ্লেষকরা এ-ও মনে করেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে স্বপ্ন দেখে আসছে তা কিছুটা হলেও পূরণ হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল মিলেমিশে কাজ করার বিষয়ে যে কমিটি গঠন হলো, তা ইতিবাচক। দেশে তেলের সংকটে মানুষের কষ্ট হচ্ছে সত্য। মানুষের এই কষ্ট সরকার ও বিরোধী দল অনুধাবন করে পদক্ষেপ নেওয়া অবশ্যই দেশের জন্য মঙ্গলজনক। তিনি বলেন, আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে, এ ধরনের সংকটের সময় বিরোধী দল পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে সুবিধা নেয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দলও সমস্যার সমাধান চায় এবং সরকারি দলও সংকট নিরসনে বিরোধী দলের প্রস্তাবকে আমলে নিতে চায়। এটাই জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ছাত্র-জনতার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
সুজন সম্পাদক বলেন, সংবিধান সংস্কারসহ অন্য যেসব বিষয় রয়েছে সে বিষয়গুলোতেও সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে বলে আশা করব। যদিও এ বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলাম না। কিন্তু সংসদের যে চিত্র দেখেছি, তাতে আশা কিছুটা হলেও বেড়েছে।
অতীত রাজনীতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তখন নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তুলে ‘সরকারকে একদিনও সুখে থাকতে দেব না’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এখন রাজনৈতিক ওই সংস্কৃতি নেই-এটাই ভালো দিক।
প্রসঙ্গত, দেশে জ্বালানি সংকট নিয়ে বুধবার জাতীয় সংসদে ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ বিষয়ে একটি নোটিশ এনেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। সেটি নিয়ে সংসদে ব্যাপক আলোচনা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘কমন কমিটি’ করার প্রস্তাব দেন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানান, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রস্তাব বিবেচনায় নেবে সরকার। তাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে কিছু থাকলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।
এদিকে বিরোধী দলের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার কথাও সংসদে জানান। প্রধানমন্ত্রী সরকারি দলের পক্ষ থেকে কমিটির পাঁচ সদস্যের নামও প্রস্তাব করেন। সেই সঙ্গে তিনি বিরোধী দল থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আলোচনায় সবাই একমত হন যে, জ্বালানি নিয়ে সমস্যা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিরোধীদলীয় নেতা প্রস্তাব করেছিলেন, তাদের কিছু পরামর্শ আছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল একসঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারে। বিএনপি সব সময় মানুষের স্বার্থে যে কোনো আলোচনা, যে কারও সঙ্গে করতে প্রস্তুত-উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারই প্রেক্ষাপটে মাননীয় স্পিকার, আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করছি। আমি আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিরোধী দলকে অনুরোধ করব, উনারাও যদি পাঁচজনের নাম দেন তাহলে এই ১০ জন ব্যক্তি বসে এই বিষয়গুলো আলোচনা করতে পারেন। কোনো পরামর্শ থাকলে এই কমিটির মাধ্যমে তা সরকারের কাছেও এলো এবং সরকার সেটির মধ্যে কোনো বাস্তবতা থাকলে অবশ্যই তা কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখার জন্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছে। জাতীয় স্বার্থে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এক হলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যাবে। দেশ ও দেশের মানুষ ভালো থাকবে। তিনি ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, যখনই কোনো সংকট তৈরি হয়েছে সরকার ও বিরোধী দল পারস্পরিকভাবে কাঁধে কাঁধ মিলে কাজ করেছে। বাংলাদেশেও এই সংস্কৃতি চালু হওয়া দরকার। তিনি বলেন, আমরা আগের সংস্কৃতিতে ফিরে গেলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না এবং সবারই ক্ষতি হবে। মোটা দাগে জাতীয় স্বার্থে সব দলেরই একমত হওয়া দরকার।
জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করলে এর প্রভাব তৃণমূলে কিছুটা হলেও পড়বে বলে মনে করেন এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ইদানীং সংঘাত-সংঘর্ষ লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে যখন শীর্ষ নেতারা একসুরে কথা বলবেন, তখন সেখানে এর ইতিবাচক প্রভাব কিছুটা হলেও পড়বে। এ ধরনের সংঘাত কিছুটা হলেও কমবে।
জ্বালানি সংকট সমাধানের পাশাপাশি সংস্কার বিষয়েও সরকার ও বিরোধী দলের একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলে মনে করেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দল সংসদ ও রাজপথে সরব রয়েছে। কিন্তু সংস্কারের বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দল নিজেরা বসে আলোচনা করে সমাধান করতে পারে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চাইলে দেশে সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য সব রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে সই করেছে। এখন তা বাস্তবায়নের সময় এসেছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।