Image description

কক্সবাজারের টেকনাফে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীলখালী এলাকার গহিন পাহাড় থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

নিহতরা হলেন টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী গ্রামের নুরুল কবিরের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৫), রুহুল আমিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম রবি (২০) এবং মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে নুরুল বশর ওরফে কালানি (২৫)।

 

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভাগবাটোয়ারা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে তাদের হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, নিহতরা চিহ্নিত ডাকাত ও মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য হতে পারেন। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।

 

পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় অপর দুজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাদের মৃত্যু হয়। নিহতদের মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

 

জানতে চাইলে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ দুজয় বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভাগবাটোয়ারা সংক্রান্ত অন্তঃদ্বন্দ্বে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করছি। এর পেছনে মানবপাচার ও অপহরণের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।’

 

তিনি জানান, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে শাহেনা আক্তার নামের এক নারী তার স্বামী নুরুল বশর ওরফে কালানির খোঁজে বের হয়ে পাহাড়ের ভেতরে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত দুজন মানবপাচার ও অপহরণে জড়িত ছিলেন। বিষয়টি এলাকায় প্রকাশ্য থাকলেও ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতেন না।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র অপহরণ ও মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের ভয়ে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ আতঙ্কে বসবাস করছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আরিফ বলেন, ‘ঘটনাস্থল নিহতদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। উদ্ধারকালে দা, লাঠি ও ছুরি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের এলাকায় এখন সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়।’

 

আরেক বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এলাকার একপাশে সমুদ্র, অন্যপাশে পাহাড়। অপহরণ ও মানবপাচারকারী চক্রের কারণে সন্ধ্যার পর কেউ ঘর থেকে বের হতে পারে না। বহুবার প্রশাসনিকভাবে অভিযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। নিয়মিত চিরুনি অভিযান জরুরি।’

 

এদিকে স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, মঙ্গলবার সকালে একই পাহাড়ি এলাকা থেকে এক ব্যক্তি কৌশলে পালিয়ে এসে অপহরণের একটি ঘটনার কথা স্থানীয়দের জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার শামলাপুর বাজার এলাকা থেকে মিস্ত্রির কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ও আরেকজনকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে যায়। পাহাড়ে গাছের সঙ্গে শেকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।

 

নিহত আমিনুল ইসলাম রবির বাবা রুহুল আমিন বলেন, ‘রাতে মুজিব আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে যায়। সকালে পাহাড়ে লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে গিয়ে ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাই। কেন এমন হলো, বুঝতে পারছি না।’

 

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, মরদেহগুলোর শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং মাথায় জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অপহরণ ও মানবপাচার সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটতে পারে।

 

বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ দুজয় বিশ্বাস বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে অপরাধীরা আগেই খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে পাওয়া যায় না।’

 

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহতদের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে।’