নগরে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। নগরের বিভিন্ন এলাকায় এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
গত ১২ এপ্রিল নগরের চকবাজার থানার ডিসি রোড এলাকায় দুই গ্যাংয়ের বিরোধে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ নিহত হন।
এ অবস্থায় কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান জোরদার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। গত মার্চ থেকে চলতি মাসের পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ২২৫ জনের অধিক গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জামালখান, গণিবেকারি, চকবাজার, হালিশহর, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। ‘ডেঞ্জার’, ‘ফোর জিরো সেভেন’, ‘পাইথান’, ‘বিগু’, ‘এমবিএস’, ‘কেবি’, ‘এনএস’ ও ‘ট্রিপল নাইন’ নামে পরিচিত এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত বলে জানা গেছে। সম্প্রতি জামালখান এলাকায় ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’ প্রকাশ্যে মিছিল ও অস্ত্রের মহড়া দেয়।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন জানান, ডেঞ্জার গ্রুপের সদস্যরা দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে নিয়মিত মহড়া দিয়ে আসছিল। আগে তারা আড়ালে থাকলেও এখন প্রকাশ্যে এসে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে এবং মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
নগরের চকবাজার এলাকা কেন্দ্রিক ‘ফোর জিরো সেভেন’ নামে একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এই গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন। গত ৪ এপ্রিল বাকলিয়া থানার মিয়াখান নগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মোরশেদ খান ও শওকত খান গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বয়স ১৯ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, উভয় পক্ষেই কিশোর গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অন্যদিকে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের পাহাড়তলী এলাকায় আকাশ দাশ নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পূর্ববিরোধের জেরে ১০ থেকে ১৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্য মিলে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে বলে জানা যায়। এ ঘটনায় র্যাব অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের বয়স ২০ বছর। নগরের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট (এমবিএস)’ নামে আরেকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এই গ্রুপে প্রায় ৩০ জন সদস্য রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এ গ্যাংয়ের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর কিছুদিন তাদের কার্যক্রম স্থবির থাকলেও বর্তমানে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া বায়েজিদ বোস্তামী, কোতোয়ালী, চন্দগাঁও, আকবরশাহ, ইপিজেড ও সদরঘাটসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি এবং মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, এসব গ্যাংয়ে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ছাড়াও বেকার তরুণ এবং বিভিন্ন দোকান ও কারখানায় কর্মরত ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী যুবকরাও যুক্ত রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আগের পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’রা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাদের শূন্যস্থান নতুন কিছু গোষ্ঠী পূরণ করছে, যা কিশোর গ্যাং কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় করে তুলেছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদ জানান, দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বের জেরে কলেজ শিক্ষার্থী আশফাক কবির সাজিদকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ডে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে গত ২ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নেওয়ার বিষয়েও তিনি সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কিশোর গ্যাংয়ের পুনরুত্থান মূলত সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক অবস্থান, স্কুলিং, শিক্ষা কার্যক্রম, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, সামাজিক অব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ফল। অনেক কিশোর হতাশা, স্বীকৃতি ও পরিচয়ের খোঁজে গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে, যা পরে সংঘবদ্ধ অপরাধে রূপ নিচ্ছে। মাদক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এ প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংশোধন কেন্দ্রগুলো সংশোধনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলমান রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, এসব গ্যাংয়ের পেছনে যেসব ‘বড় ভাই’ পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।